ঢাকা রোববার, ২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে ব্যবসায়ীদের শঙ্কা

চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে ব্যবসায়ীদের শঙ্কা

প্রতিবছর কোরবানিতে অনেক মৌসুমি কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী লোকসান দেন। শুধু কি লোকসান, জাতীয় সম্পদ খ্যাত মিসকিন-এতিমদের হক হিসেবে পরিচিত কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে বিশৃঙ্খলা, মারামারি, চামড়া নষ্ট করে স্তূপ আকারে ফেলে যাওয়াসহ নানান ঘটনা ঘটে। কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা বলছেন, মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের চামড়ার আকার, বর্গফুটের পরিমাপ, মান, সময়, পরিবহন খরচ, তাপমাত্রা, লবণযুক্ত চামড়ার দাম ইত্যাদি অনেক কিছু বুঝতে হবে, জানতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, কোরবানির আগেই আড়তে যোগাযোগ করে ধারণা নেওয়া। কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক একটি গরুর চামড়া কত বর্গফুট হয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুছ জানান, গরু যত বড় হবে চামড়াও বড় হবে। ৩-৪ লাখ টাকা দামের একটি বড় গরুর চামড়া ৩০-৩৫ বর্গফুট হতে পারে। তবে কোরবানিতে বেশি পাওয়া যায় ছোট ও মাঝারি গরুর চামড়া। একটি ছোট গরুর চামড়া ১০-১৫ বর্গফুট, মাঝারি হলে ১৮-২০ বর্গফুট হতে পারে। বড় গরুর চামড়া ২৬-২৮ বর্গফুট হয়ে থাকে। আমাদের হিসেবে যে চামড়া ২০ বর্গফুট, ট্যানারিতে সেই চামড়া ১৮ বর্গফুট। চামড়া লবণ দেওয়ার সময় দক্ষ শ্রমিক দিয়ে টান টান করে লবণ দিলে বর্গফুটের হিসাবে লাভ হয়। সাধারণত গ্রামের কোরবানির চামড়া ছোট-মাঝারি হয়। শহরের চামড়া বড় হয়। বিশেষ করে আবাসিক এলাকা বা বিত্তশালীদের কোরবানির পশুর চামড়া বড় হয়। এ ধরনের চামড়ার কদর বেশি, দামও বেশি। যেহেতু কোরবানির সময় অদক্ষ মানুষজন মাংস কাটাকুটিতে নিয়োজিত হন। তাই পশুর চামড়া বিভিন্ন জায়গায় কেটে যায়। এ ধরনের চামড়া নিতে চায় না ট্যানারি মালিকরা। তিনি বলেন, মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের অনেক বিষয় জানতে হবে, বুঝতে হবে। বর্গফুটের হিসাব, চামড়ার মান, গাড়িভাড়া, চামড়া ছাড়ানোর পর কত সময় গত হয়েছে ইত্যাদি জানতে হবে। স্তূপের মধ্যে উপরের দিকে দুই একটা বড় চামড়া সাজিয়ে শুধু লেজ গুনে চামড়া বিক্রি করা চেষ্টা করলে হবে না।

কোরবানি দাতা থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এক দামে চামড়া কেনেন। পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচ এবং লাভ যোগ করে বাজারে বিক্রি করেন। সেখানে আড়তদারের লোকজন সেটি কেনেন। আড়তদার লবণযুক্ত করে বিক্রি করেন ট্যানারিতে। তারপর জটিল প্রক্রিয়া শেষে তৈরি হয় ফিনিশড গুড বা জুতো, ব্যাগ, পোশাকসহ নানা দামি পণ্য। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাঁচটি চামড়ার দামেও এক জোড়া ব্রান্ডের চামড়ার জুতো কেনা যায় না। বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সহ-সভাপতি সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান জানান, মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের কাঁচা চামড়া ও লবণযুক্ত চামড়ার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। সরকার যে দাম ঘোষণা করেছে তা লবণযুক্ত চামড়ার এবং এটা দেবে ট্যানারি মালিক। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে চামড়া বিক্রি করছে তা আড়তদারের কাছে। এখন আড়তদার দক্ষ কর্মী দিয়ে চামড়া সাফ করে প্রতি চামড়ায় ৮-১০ কেজি লবণ যুক্ত করে দুই মাস সংরক্ষণ করে গাড়ি ভাড়া করে ঢাকার ট্যানারিতে পাঠিয়ে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করবে। প্রতিটি চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেনার পর লবণযুক্ত করে ট্যানারিতে নেওয়া পর্যন্ত আড়তদারের বাড়তি খরচ প্রায় ৪৯৮ টাকা। এর মধ্যে চামড়া প্রতি লবণের দাম ধরা হয়েছে ১৪০ টাকা। লেজ, কান, মাংস ও চর্বি সাফ করে লবণ যুক্ত করার মজুরি ১০০ টাকা। কাঁচা চামড়া পরিবহন, প্যান্ডেল, শ্রমিকদের আপ্যায়ন, বিদ্যুৎ খরচ ৪০ টাকা। চামড়ার গাদি (স্তূপ) ভাঙা ও লাট দেওয়া ১৫ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চামড়া পরিবহন ৩০ টাকা। চামড়া উঠানোর লেবার খরচ ৮ টাকা। ঢাকার আড়ত ভাড়া ৪০ টাকা। ট্যানারি মালিক শতকরা ১৫-৩০ শতাংশ চামড়া হিসাবে বাদ দেওয়া বাবদ প্রতি পিসে কমে যায় ১২০ টাকা। এখন ১৫ বর্গফুটের একটি গরুর চামড়ার জন্য ট্যানারির কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত দাম পাব ৯৩০ টাকা। এর মধ্যে লবণযুক্ত করা থেকে ট্যানারিতে পৌঁছানো পর্যন্ত খরচ ৪৯৮ টাকা বাদ দিলে চামড়ার দাম বাকি থাকে ৪৩২ টাকা। সুতরাং নানা স্তরে চামড়ার দরদাম সম্পর্কে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ধারণা থাকতে হবে।

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম গত বছরের তুলনায় দুই টাকা বাড়ানো হয়েছে, নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।

অন্যদিকে, ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। গত বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কোরবানি সম্পর্কিত বিষয়াদির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ সভা শেষে সাংবাদিকদের এ দাম জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।গরুর পাশাপাশি খাসি ও বকরির চামড়ার দামও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ নিয়ে নানা উদ্যোগ থাকলেও শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গরমের মৌসুম হওয়ায় পশু জবাইয়ের পর চামড়া রেডি হলে ৮-১০ ঘণ্টা চামড়ার মান ভালো থাকে। এ সময়ের মধ্যে প্রসেসিং করে লবণ দিতে হবে। ২২-২৪ ঘণ্টা হলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। বেশ কয়েক বছর কোরবানির মৌসুমে চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে মাদ্রাসা, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনা বেচা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অতীতে অনেক মাদ্রাসা নিজস্ব উদ্যোগে চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করলেও এবার এ সংখ্যা কমছে। যদিও সরকার লবণ দিয়ে সহযোগিতা করছে। জানতে চাইলে আনজুমানের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতেয়ার জানান, আনজুমান পরিচালিত মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো জাতীয় সম্পদ চামড়া রক্ষার খাতিরে সংগ্রহ করবে। তবে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা এখনও নেওয়া হয়নি। প্রাথমিকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে সংগৃহীত চামড়া স্পটে বিক্রি করে দেওয়া হবে। মহানগরের চামড়া জামেয়া মাঠে নিয়ে আসা হবে। কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সহ-সভাপতি সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিভিন্ন মাদ্রাসায় চামড়া সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিলে প্রশিক্ষিত শ্রমিক দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চামড়া সাফ করে লবণ দিতে হবে।

সরকার চামড়া ছাড়ানো, লবণযুক্ত করে সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলে বা গণমাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করলে ভালো হতো। তিনি বলেন, বৃহত্তর চট্টগ্রামের চামড়া লবণযুক্ত করে সংরক্ষণের জন্য আমিন জুট মিল বা এশিয়াটিক কটন মিলের কিছু জায়গা বরাদ্দ দিলে দেশের উপকারে আসত।

গত বছর সংগ্রহ হয়েছিল প্রায় তিন লাখ ৫৬ হাজার ৫০০টি। এর মধ্যে তিন লাখের বেশি ছিল গরুর চামড়া। চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামটি লবণযুক্ত করে সংরক্ষণের পরের দাম, যা অনেক কোরবানিদাতা কিংবা মৌসুমি ব্যবসায়ী বোঝেন না। তারা মনে করেন, আড়তদাররা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনবেন। এখন বেশ গরম। আমাদের অনুরোধ থাকবে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহের পর যেন তা রোদে এবং গাড়িতে স্তূপ করে না রেখে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখেন। দ্রুততম সময় আড়তে পৌঁছে দেওয়া উচিত। গভীর রাতে আড়তে চামড়া আনার পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে। কারণ আড়তদার, চামড়া সাফ করে লবণযুক্ত করার শ্রমিকের সক্ষমতা, লবণের মজুত, চামড়ার মান রক্ষা ইত্যাদি অনেক বিষয় জড়িত। দেশে কোরবানির সব পশুর চামড়া সংরক্ষণ, বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের জন্য ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সুযোগ চান চট্টগ্রামের আড়তদাররা। বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুছ বলেন, আমি গত বছর ট্যানারিতে বিক্রি করা চামড়ার ৪৫ লাখ টাকা আটকে আছে। চামড়া বিক্রির ২৩ লাখ টাকা আদায়ে মামলা চলছে। এবার চামড়া কেনার পুঁজিই নেই আমার। আমাদের সমিতিতে সদস্য ১১২ জন হলেও লোকসানের কারণে এখন ৩০-৪০ জন কাঁচা চামড়ার আড়তদারি করছেন। বাকিরা নিঃস্ব হয়ে গেছেন। জাতীয় সম্পদ চামড়ার জন্য যদি সরকার ওয়েট ব্লু রপ্তানির সুযোগ দেয় তাহলে চামড়া নিয়ে শঙ্কা দূর হবে। লবণযুক্ত চামড়া আড়াই মাস সংরক্ষণ করার মধ্যে ওয়েট ব্লু করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, গত ১৭ মে চসিক কার্যালয়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে সমন্বয় সভা করেছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বৃহস্পতিবার (২১ মে) প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক হয় চামড়ার আড়তদার ও ট্যানারি মালিকের সঙ্গে। চসিক মেয়র বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নগরের বাইরের চামড়া এনে কৃত্রিমভাবে দাম কমানোর চেষ্টা করে। আবার কিছু খণ্ডকালীন বা মৌসুমি ব্যবসায়ী একদিনের জন্য ব্যবসায় নেমে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে চামড়া রাস্তায় ফেলে চলে যায়। এতে পরিবেশ দূষিত হয়, দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় রাস্তায় পড়ে থাকা চামড়ার কারণে দুর্ঘটনাও ঘটে। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যেকোনোভাবে শহর ক্লিন রাখা। কোরবানির পশু জবাইয়ের পর দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ও চামড়া সংরক্ষণ না করা গেলে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, খণ্ডকালীন ব্যবসায়ীরা যাতে চামড়া রাস্তায় ফেলে না দেয়, সেজন্য আপনারা সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত দামে চামড়া কেনার উদ্যোগ নিন। এতে পরিবেশও রক্ষা পাবে, নগরও পরিচ্ছন্ন থাকবে। আমরা চাই ঈদুল আজহার সময় নগরে কোনো ধরনের অরাজকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হোক। চামড়া ব্যবস্থাপনায় সবাই দায়িত্বশীল হলে কোরবানিদাতারাও ন্যায্যমূল্য পাবেন, পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত