
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু দীর্ঘদিনের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা এখন চরম চাপের মুখে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসলেও সেই তুলনায় হাসপাতালের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনেক রোগীকে শয্যার পরিবর্তে সিঁড়ি, বারান্দা ও করিডোরে অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সরকারিভাবে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট। ২০০৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সে অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে সীমিত জনবল দিয়ে বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালের সেবাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। নির্ধারিত বেড না পেয়ে অনেক রোগী মেঝেতে, বারান্দায় কিংবা সিঁড়ির পাশে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এতে রোগীদের স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হলেও অনেক সময় বেড পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অনুমোদিত পদের তুলনায় বর্তমানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা অনেক কম। হাসপাতালে চিকিৎসক থাকার কথা ৪০ জন, বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। নার্স থাকার কথা ৩৭ জন হলেও কর্মরত রয়েছেন ২৭ জন। ক্লিনার থাকার কথা ৬ জন; কিন্তু দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৩ জন।
এছাড়া (এমএলএসএস) চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে ৪ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ১ জন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকার কথা ৮ জন, সেখানে কর্মরত আছেন ৬ জন। ফলে রোগ নির্ণয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রমে প্রতিনিয়ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম বলেন, প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা চালাতে হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৯০০ রোগী দেখা, ভর্তি রোগী সামলানো, অপারেশন করা-সবই করতে হয় আমাদের। প্রায় দুই বছর ধরে কোনো গাইনি বিশেষজ্ঞ নেই, ফলে গর্ভবতী নারীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, গর্ভবতী নারীদের জরুরি অস্ত্রোপচার (সিজারিয়ান) অনেক সময় তাকেই করতে হচ্ছে, যদিও এটি তার মূল দায়িত্ব নয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দুইজন চিকিৎসক প্রায় এক দশক ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পদগুলো শূন্য হিসেবে দেখানো না হওয়ায় নতুন নিয়োগও দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে চিকিৎসক সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২২ সালে হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন চালু হলেও আজ পর্যন্ত কোনো এক্স-রে টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। চিকিৎসকরা নিজেদের উদ্যোগে ও অর্থ সংগ্রহ করে বাইরে থেকে একজন টেকনিশিয়ান এনে তার বেতন বহন করছেন।
একজন সংশ্লিষ্ট টেকনিশিয়ান বলেন, যন্ত্রপাতি থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সব সুবিধা চালু রাখা যায় না। আবার অনেক যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, মেরামতেরও উদ্যোগ কম। হাসপাতালে কোনো ইলেকট্রিশিয়ান না থাকায় সামান্য বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানেও বাইরে থেকে লোক ডেকে আনতে হয়। অনেক সময় লোক না পাওয়ায় দিনের পর দিন রোগী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
হাসপাতালে ক্লিনারের অধিকাংশ পদ শূন্য। বর্তমানে মাত্র তিনজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে পুরো হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও হাসপাতাল এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসক ও নার্স সংকট থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা সীমিত সক্ষমতা নিয়ে সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং জনবল ঘাটতি সত্ত্বেও তারা রোগীদের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। ফলে হাসপাতালের ভেতরের বিদ্যমান চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে।
উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অধিকাংশ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ রোগীরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভিড় করছেন, এতে মূল হাসপাতালের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার, ডায়াগনস্টিক ল্যাব, এক্স-রে মেশিন, শিশু ও প্রসূতি ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন আধুনিক সুবিধা থাকলেও দক্ষ জনবল সংকটের কারণে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সরকার দেশের বিভিন্ন ৫০ শয্যার উপজেলা হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসাসেবার পরিধি, শয্যা সংখ্যা, জনবল ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে প্রথম ধাপেই উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, রোগী ও সচেতন মহল। তাদের মতে, প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের চিকিৎসার চাপ বহন করা ৫০ শয্যার এই হাসপাতাল বহু বছর ধরেই বাস্তব চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর করা গেলে মূল হাসপাতালের ওপর চাপও কমবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সরকারের হাসপাতাল সম্প্রসারণ উদ্যোগে রায়পুরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে দীর্ঘদিনের চিকিৎসাসংকট অনেকটাই কমে আসবে এবং সাধারণ মানুষ মানবিক ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে।
চিকিৎসক ও জনবল সংকট, সীমিত শয্যা এবং বাড়তি রোগীর চাপে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।