
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাটির ঘর ধসে পড়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে। একই দিনে দুটি পৃথক ঘটনায় একদিকে একটি পরিবারের প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে মাটির ঘরের দেয়ালচাপায় ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় উপজেলার মাটির ঘরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। জানা যায়, উপজেলার আমলাব ইউনিয়নের পাহাড় উজিলাব গ্রামের বাসিন্দা হারুন মিয়ার মাটির বসতঘর টানা বৃষ্টিতে হঠাৎ ধসে পড়ে। ঘরের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ গৃহস্থালির প্রায় সব মালামাল মাটির নিচে চাপা পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বর্তমানে পরিবারটি খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অপরদিকে, একই ইউনিয়নের ধুকুন্দি কালিয়ারমোড় গ্রামের ৭০ বছর বয়সী রওশোনা বেগম নিজ ঘরে থাকা অবস্থায় মাটির দেয়াল ধসে চাপা পড়েন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এদিকে শুধু আমলাব ইউনিয়নেই নয়, বেলাবো উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের একাধিক এলাকায়ও টানা বৃষ্টিতে মাটির ঘর ধসে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ফলে মাটির ঘরে বসবাসকারী অসংখ্য পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। স্থানীয়দের দাবি, বেলাবো উপজেলার লাল মাটির অঞ্চলগুলোতে এখনও শত শত পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ মাটির ঘরে বসবাস করছে। তাই আরও প্রাণহানি এড়াতে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ঘরগুলো চিহ্নিত করে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
আমলাব গ্রামের বাসিন্দা মো. জলীল মিয়া বলেন, আমাদের এলাকার বেশিরভাগ ঘরই মাটির। আমার নিজের ঘরও মাটির। টানা বৃষ্টির কারণে এখন দেয়ালগুলো নরম হয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই কোথাও না কোথাও ঘর ধসে পড়ছে। আমরা সবাই আতঙ্কে আছি।
ধুকুন্দি গ্রামের বাসিন্দা সুমন রাজ বলেন, বেলাবো উপজেলার লাল মাটির অঞ্চলে এখনও অনেক মানুষ মাটির ঘরে বসবাস করেন। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে এসব ঘর ধসে পড়ে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটছে। সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে যদি এসব ঘর সংরক্ষণ, সংস্কার বা নিরাপদভাবে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে একদিকে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে বাংলার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মাটির ঘরও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে টিকে থাকবে।
আমলাব ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলম বলেন, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে অনেক মাটির ঘরের দেয়াল নরম ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আমরা সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে বসবাস না করে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি আমলাব ইউনিয়ন বিএনপির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে। আমলাব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল হাসান বলেন, ভারী বর্ষণে মাটির ঘর ধসে পড়ার ঘটনাগুলো অত্যন্ত দুঃখজনক। ইতোমধ্যে পাহাড় উজিলাব গ্রামের একটি এবং ধুকুন্দি গ্রামের একটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসহ মোট দুইটি পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য তালিকাটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, সরকারি সহায়তা দ্রুতই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে।
বেলাবো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাইলাতুল হোসেন বলেন, যাদের মাটির ঘর ধসে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাদের তথ্য সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমিও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শনে যাব।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছি ক্ষতিগ্রস্ত দের তালিকা করতে এবং যারা ঝুঁকিতে আছেন তাদের কে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল নিহত পরিবারের প্রতি শোক প্রকাশ করে বলেন, মাটির ঘরের দেয়াল ধসে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে, টানা বৃষ্টিতে মাটির ঘরে যারা ঝুঁকিতে আছেন তাদেরকে নিরাপদে আনার নির্দেশনা দিয়েছি।