
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা এবং পাহাড়ধসে গত সাত দিন ধরে কার্যত স্থবির হয়ে ছিল পার্বত্য জেলা বান্দরবানের জনজীবন। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কাটিয়ে গত রোববার থেকে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানিও কমতে শুরু করেছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে জেলায় এখন পর্যন্ত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে চাপা পড়ে ৫ জন এবং পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের মাটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরো জেলায় অন্তত ২৬টি স্থানে ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অসংখ্য পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জেলা সদরের আর্মি পাড়া, ক্যাচিংঘাটা, শেরেবাংলা নগর, বালাঘাটার আমবাগান, ফজর আলী পাড়া, ব্রিগেড এলাকা, পুলিশ লাইনস, ইসলামপুর, হিলবার্ড এলাকা, উজানীপাড়া, মেম্বারপাড়া, কলাঘাটা, সদর ইউনিয়নের গুয়ালিয়াখোলা, লেমঝিরি, কুহালং ইউনিয়নের মিনঝিরিপাড়া, কেয়ামলং, বাকিছড়া, মুসলিমপাড়া ও পলুপাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।
এদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী, ঘুমধুম, দোছড়ি, সোনাইছড়ি ও সদর ইউনিয়নের নিচু এলাকাগুলোও প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে।
থানচি উপজেলার থানচি–বান্দরবান সড়কের বাগানপাড়া এলাকায় সেতুর ওপর দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহিত হওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন সড়কের নিচু অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে রেমাক্রী ও তিন্দু ইউনিয়নের নৌপথেও যোগাযোগ বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রুমা উপজেলার কেউক্রাডংরুমা সংযোগ সড়কে পাহাড়ধসের কারণে বগালেক এলাকায় কয়েকশ পর্যটক আটকা পড়েন। এছাড়া উপজেলা সদরের বেতেলপাড়া এলাকায় সেতুর ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে পানিবন্দি ছিলেন ইডেনপাড়ার বাসিন্দারাও। টানা বর্ষণে জেলার নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানীয় জল ও শুকনো খাবারের তীব্র সংকট দেখা দেয়।
দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা নগদ আর্থিক সহায়তা এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত ১৫ হাজার পরিবারের মধ্যে খাদ্যসহায়তা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যার পানি দ্রুত কমতে শুরু করলেও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।