প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
রমজান মাসের রোজা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি মানবদেহের জৈবিক প্রক্রিয়ার এক অনন্য সংস্কার পদ্ধতি যা আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশদভাবে আলোচিত। চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি পর্যন্ত রোজার প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং সুদূরপ্রসারী।
রোজা বা উপবাস হলো স্বেচ্ছায় অন্ন ও পানি ত্যাগ করা, যা মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসংস্থানকে পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ দেয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান একে ‘মেটাবলিক সুইচিং’ হিসেবে অভিহিত করে, যেখানে শরীর গ্লুকোজের বদলে চর্বি পুড়িয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এটি শরীরের প্রতিটি কোষের জন্য একটি বিশেষ শুদ্ধি অভিযান, যা বার্ধক্য রোধে এবং দীর্ঘায়ু লাভে সহায়তা করে। বিভিন্ন ধর্মের মৌলিক ঐতিহ্যের রোজার গুরুত্ব স্বীকৃত, যা মানুষের আত্মিক ও শারীরিক প্রশান্তির মেলবন্ধন ঘটায়। মূলত, রোজা হলো এমন এক সামগ্রিক অনুশীলন যা মানুষকে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে নতুনভাবে গড়ে তোলে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিটি গবেষণাই-এর উপযোগিতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার সবচেয়ে বড় অবদান হলো ‘অটোফ্যাজি’ প্রক্রিয়া সক্রিয় করা, যার জন্য জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘক্ষণ উপবাস থাকার ফলে শরীরের কোষগুলো নিজের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এবং টক্সিনগুলো ভক্ষণ করে ফেলে, যা ক্যান্সার বা আলঝেইমারের মতো রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। এই প্রক্রিয়ায় শরীরের অভ্যন্তরীণ ময়লা পরিষ্কার হয় এবং নতুন ও স্বাস্থ্যকর কোষ উৎপাদিত হতে থাকে। নিয়মিত রোজার মাধ্যমে এই কোষীয় পুনর্জন্ম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, যা শরীরকে রোগমুক্ত রাখতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। এটি শুধু রোগ নিরাময় নয়, বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
জীববিজ্ঞানের বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোজা রাখার ফলে মানবদেহের হরমোন নিঃসরণ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে ‘হিউম্যান গ্রোথ হরমোন’ (HGH) এর মাত্রা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যা পেশি গঠন এবং মেদ হ্রাসে সরাসরি কাজ করে। এছাড়া ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়ার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কোষীয় পর্যায়ে জিনের অভিব্যক্তি পরিবর্তিত হয়, যা শরীরকে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন থেকে রক্ষা করে। এভাবে জীববিজ্ঞান প্রমাণ করে যে রোজা শরীরের অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিনকে পুনরায় সচল করার এক প্রাকৃতিক চাবিকাঠি।
রাসায়নিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, রোজা রাখার ফলে রক্তে লিপিড প্রোফাইলে ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল (LDL) এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমে গিয়ে উপকারী কোলেস্টেরল (HDL)-এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা হৃৎপিণ্ডের ধমনীগুলোকে সুস্থ রাখে। শরীরের অম্ল-ক্ষারক (pH) ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং রক্ত থেকে ইউরিক অ্যাসিডের মতো বিষাক্ত উপাদান বের করে দিতে রোজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যকৃতের ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়ায় এনজাইমের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, যা শরীর থেকে ভারী ধাতু ও রাসায়নিক বর্জ্য অপসারণে সাহায্য করে। এই রাসায়নিক পরিবর্তনগুলো সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনীশক্তি ও কর্মক্ষমতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে রোজা হলো মানসিক দৃঢ়তা এবং ধৈর্য ধারণের এক চরম পরীক্ষা। দীর্ঘ সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সংবরণ করার মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কে ‘ব্রেইন-ডিরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর’ (BDNF) নামক প্রোটিন বৃদ্ধি পায়, যা স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা উন্নত করে। এটি বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ কমিয়ে মনে প্রশান্তি আনে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বা ‘উইলপাওয়ার’ বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, রোজাদার ব্যক্তিদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ও নেতিবাচক আবেগ নিয়ন্ত্রণের হার অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এভাবে রোজা মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক অভাবনীয় মনোবৈজ্ঞানিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রোজা শুধু ইসলাম ধর্মেই নয়, বরং হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও ইহুদি ধর্মেও কোনো না কোনো রূপে বিদ্যমান। সকল ধর্মই উপবাসকে আত্মার পরিশুদ্ধি এবং মহান স্রষ্টার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে। ইসলামে রোজাকে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের পথ বলা হয়েছে, যা মানুষকে রিপু নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আধুনিক বিজ্ঞান এই ধর্মীয় বিধানের গভীরতা বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, আধ্যাত্মিক একাগ্রতা মানুষের শরীরের কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমিয়ে স্ট্রেস মুক্ত রাখে। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে যখন বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটে, তখন রোজা এক পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শনে রূপান্তরিত হয়।
সমাজবিজ্ঞানের আলোকে রোজা হলো সামাজিক সংহতি এবং সহমর্মিতা চর্চার একটি অনন্য মঞ্চ। যখন একটি সমাজের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই সময়ে উপবাস পালন করে, তখন একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ তীব্রতর হয়। ক্ষুধার জ্বালা অনুভবের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের প্রতি ধনীদের দয়ার উদ্রেক ঘটে, যা সামাজিক বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক। ইফতার মাহফিল এবং যৌথ প্রার্থনা সামাজিক যোগাযোগকে আরও মজবুত করে এবং একাকীত্ব দূর করতে সাহায্য করে। এই যৌথ অভিজ্ঞতা সমাজে শান্তির পরিবেশ বজায় রাখতে এবং সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোজা মানুষের মধ্যে পরিমিতিবোধ ও মিতব্যয়িতা শিক্ষা দেয়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে রমজানে কেনাকাটা বাড়ে; কিন্তু রোজার মূল আদর্শ হলো অপচয় রোধ করা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। জাকাত ও সদকার মাধ্যমে সম্পদ যখন ধনীদের হাত থেকে গরিবদের কাছে যায়, তখন তা অর্থনীতিতে অর্থের তারল্য বৃদ্ধি করে এবং দারিদ্র?্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের সাশ্রয় হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুতরাং, রোজার অর্থনৈতিক তাৎপর্য কেবল ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে নয়, বরং সমষ্টিগত সমৃদ্ধিতে নিহিত। সাধারণ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার প্রভাব হলো- শরীরের ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা জৈবিক ঘড়ির সাথে প্রকৃতির সমন্বয় সাধন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন শরীরের মেটাবলিক কার্যক্রমকে দিনের আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। এটি ঘুমের মান উন্নয়ন করে এবং দিনের বেলা কর্মোদ্যম বজায় রাখতে সাহায্য করে। পানি পান ও খাবার গ্রহণের বিরতি পরিপাকতন্ত্রকে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অন্ত্রের কার্যকারিতা বজায় রাখে। সাধারণ বিজ্ঞানের এই সহজ ব্যাখ্যাগুলোই প্রমাণ করে যে রোজা প্রকৃতির সাথে মানুষের শারীরিক মিলনের এক সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া।
চিকিৎসা শাস্ত্রের আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, রোজা রাখলে শরীরের প্রদাহজনক মার্কারগুলো (যেমন- ঈজচ) উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এটি হৃদরোগ, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং হাপানির মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহ কমিয়ে হজম প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে রোজার বিকল্প নেই। চিকিৎসকরা বর্তমানে ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ বা সবিরাম উপবাসকে ওজন কমানোর সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে প্রেসক্রাইব করছেন। সুতরাং চিকিৎসা শাস্ত্র এখন শুধু রোজাকে সমর্থনই করছে না, বরং রোগ নিরাময়ের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার তাৎপর্য হলো ভোগবাদী মানসিকতা কমিয়ে পৃথিবীর সম্পদের ওপর চাপ কমানো। কম খাবার গ্রহণ এবং অপচয় না করার শিক্ষা পরিবেশ সংরক্ষণে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমিত ব্যবহার এবং পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া রোজার একটি আত্মিক দাবি। যখন মানুষ তার প্রয়োজন সীমিত করে ফেলে, তখন কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাস পায় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায়। রোজার এই ‘লেস ইজ মোর’ দর্শন বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি জীবন ব্যবস্থা।
মানব বিবর্তন এবং নৃবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায়, প্রাচীনকালে মানুষ দীর্ঘসময় খাবার ছাড়াই বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখত। আমাদের শরীর সেইভাবেই বিবর্তিত হয়েছে, যেখানে সাময়িক উপবাস শরীরের জিনগত সক্ষমতাকে পুনরুজ্জীবিত করে। আধুনিক যুগের অতি-ভোজন এবং সারাক্ষণ খাবার গ্রহণের অভ্যাস আমাদের ডিএনএ-এর আদিম শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। রোজা রাখার মাধ্যমে আমরা আমাদের সেই আদিম জিনগত স্থায়িত্ব এবং প্রতিকূলতায় টিকে থাকার ক্ষমতাকে ফিরে পাই। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, উপবাসের এই ক্ষমতাটিই মানুষকে পৃথিবীতে টিকে থাকতে এবং বিবর্তিত হতে সাহায্য করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, রোজা শুধু একটি ধর্মীয় বিধানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ এক অনন্য জীবনপদ্ধতি। এটি মানুষের শারীরিক রোগমুক্তি, মানসিক ধৈর্য, সামাজিক শান্তি এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক মহৌষধ। আধুনিক বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে, রোজার অন্তর্নিহিত রহস্যগুলো তত বেশি উন্মোচিত হচ্ছে। সুতরাং সুস্থ সবল জীবন এবং সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য রোজার শিক্ষা ও অনুশীলন প্রতিটি মানুষের জন্য অপরিহার্য। রোজার এই সামগ্রিক তাৎপর্য অনুধাবন করে তা পালনের মাধ্যমেই মানবজাতি তার হারানো ভারসাম্য পুনরায় ফিরে পেতে পারে।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল