ঢাকা বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

গণতন্ত্রের নতুন পথচলা

গণতন্ত্রের নতুন পথচলা

বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বৈষম্য আর অধিকারবঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার অদম্য স্পৃহায় দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, তা শুধু একটি শাসনক্ষমতার রদবদল নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন সুযোগ। ‘গণতন্ত্রের নতুন পথচলা’ তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হব।

আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার গণতন্ত্রের জন্য লড়াই হয়েছে; কিন্তু বারবারই তা ব্যক্তিপূজা বা দলতন্ত্রের বেড়াজালে আটকা পড়েছে। এবারের অভ্যুত্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, নিছক ব্যালট বক্সের নাম গণতন্ত্র নয়।

গণতন্ত্র মানেই হলো আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জনগণের অংশীদারিত্ব। গণতন্ত্রের এই নতুন পথচলায় আমাদের প্রধান লক্ষ্য হতে হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দলীয় প্রভাবমুক্ত না হয়, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি কখনোই মজবুত হবে না। একটি টেকসই গণতন্ত্রের জন্য কয়েকটি মৌলিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে যে প্রতিহিংসার সংস্কৃতি চলছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতাই হোক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলমন্ত্র। একক ব্যক্তির হাতে সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার যে প্রবণতা আমরা দেখেছি, তা স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয়। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সংসদীয় ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রের প্রতিটি পয়সার হিসাব জনগণের কাছে থাকতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হবে।

এই নতুন যাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের তরুণ প্রজন্ম। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে, মেধা এবং সাহস দিয়ে প্রথাগত রাজনীতির জঞ্জাল পরিষ্কার করা সম্ভব। তবে রাজপথের জয়কে রাষ্ট্রে রূপান্তর করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তরুণদের শুধু রাজপথে নয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও সক্রিয় হতে হবে। তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আধুনিক রূপ দিতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, আবেগ দিয়ে আন্দোলন হয়; কিন্তু রাষ্ট্র চলে আইনের শাসনে। তাই উত্তেজনার চেয়ে ধৈর্য এবং গঠনমূলক সমালোচনা এখন বেশি প্রয়োজন।

গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়, এটি অর্থনৈতিক মুক্তিরও পথ। যদি সম্পদ শুধু মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই গণতন্ত্র সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন। নতুন এই পথচলায় আমাদের এমন একটি অর্থনৈতিক মডেল দাঁড় করাতে হবে যেখানে সুযোগের সমতা থাকবে। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য দূর করা এবং মেহনতি মানুষের শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করা গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।

সামাজিক বিচার বা ‘সোশ্যাল জাস্টিস’ নিশ্চিত না হলে সমাজের গভীরে থাকা ক্ষোভ আবারও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।

পথটি মোটেও মসৃণ নয়। পরাজিত শক্তি বা সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সব সময়ই সংস্কারের গতিকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। এছাড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং অপরাধের মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা প্রয়োজন।

গণতন্ত্র কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। ৫৩ বছরের পথচলায় আমরা অনেকবার হোঁচট খেয়েছি; কিন্তু এবার আমাদের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর শ্রেষ্ঠ সুযোগ।

একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন ছাত্র-জনতা বুকে ধারণ করেছে, তার বাস্তবায়নই হোক আমাদের অঙ্গীকার। বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমেই আমরা ‘নতুন পথচলা’কে সফল করতে পারি। ইতিহাস আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে; এই সুযোগ হাতছাড়া করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। গণতন্ত্রের এই জয়যাত্রা চিরস্থায়ী হোক।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত