প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত অথাৎ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষকে আল্লাহ এতটাই মর্যাদা দিয়েছেন যে, প্রথম মানব আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পর ফেরেশতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা যেন আদম (আ.)-কে সেজদা করেন। সেই মর্যাদাপূর্ণ ‘মানুষ’ শব্দটি কালের বিবর্তে আজ বিলুপ্তির পথে।
আমরা যদি ধর্মীয়ভাবে বিবেচনা করি, তাহলে বলতে হয়- আমরা কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউ বৌদ্ধ, কেউ আবার খ্রিস্টান। আবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করি, তাহেল বলেতে হয়- আমরা কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি, কেউ জামায়াত, কেউ জাসদ অথবা কেউ ডানপন্থি’ কেউ বামপন্থি’। এছাড়াও আরও বহু পরিচয়ে আমরা বিভক্ত।
কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়- আমরা কি সত্যিই মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারছি? আমরা এখন শুধু মানুষ নয়, আমরা বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন পদে ভূষিত। যার ফলে আমাদের মধ্যে হানাহানি, মারামারি, বিভেদ ও সংঘাত ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
‘মানুষ’ শব্দটির যথাযথ ব্যবহার ও চর্চা যতদিন না হবে, ততদিন আমাদেরও ভেতরের প্রতিহিংসা, সংঘাত, হানাহানি, মারামারি ও বিভাজন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। মানুষ হওয়া শুধু জন্মগত পরিচয় নয়; এটি একটি নৈতিক অবস্থান, একটি মানবিক চেতনা। মানবতা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও ন্যায়বোধ, এই গুণগুলোই প্রকৃত মানুষকে সংজ্ঞায়িত করে।
আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং পরবর্তী প্রজন্মেকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে। যারা ভবিষ্যতে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হবে, তাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, একই ভুল যেন পূনরাবৃত্তি না হয়। এজন্য আমাদের আগে প্রকৃত মানুষ হতে হবে।
আমরা যার যার অবস্থান থেকে যদি ‘মানুষ’ শব্দটির সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারি, তবে আমরা যে কাজেই নিয়োজিত থাকি না কেন, তা কখনও পূর্ণতা পাবে না। কারণ মনুষত্বহীন মানুষ কখনও বিবেকবান হতে পারে না, আর বিবেকবান না হলে ভালো-মন্দেও পার্থক্য বোঝা সম্ভব নয়। তাই আগে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তখনই পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সংঘাত কমে আসবে।
পরিবর্তনের সূচনা প্রথমে নিজেকে দিয়েই করতে হবে। আমরা যখন নিজেদের বদলাতে পারব, যখন রাষ্ট্রও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের শব্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এই দেশ কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি আপনার, আমার, সবার। এখানে মতভেদ থাকতে পারে, মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, তা ধর্মীয় হোক বা রাজনৈতিক। তাই বলে কাউকে হেয় করা, ছোট করে দেখা বা তাচ্ছিল্য করা কখনওই উচিত নয়।
সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই দেশ গড়ে ওঠে। সমন্বয়, পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে আমরা যদি একসঙ্গে কাজ করি, তবেই ‘মানুষ’ শব্দটির যথার্থ প্রয়োগ সম্ভব হবে। আর যখন মানুষ সত্যিকার অর্থে মানুষ হবে, তখন সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ন্যায়, শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
জসিম মজুমদার