প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আজ আর শুধু প্রযুক্তিগত কল্পনার বিষয় নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নীতিনির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আমরা যখন স্মার্টফোনে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগতকৃত সুপারিশ দেখি কিংবা চিকিৎসা নির্ণয়ে অ্যালগরিদমিক সহায়তা পাই সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে মেশিন লার্নিং। কিন্তু এই প্রযুক্তির দৃশ্যমান চেহারার আড়ালে যে মৌলিক শক্তি কাজ করে, তা হলো গণিত। আসলে মেশিন লার্নিং কোনো জাদু নয়; এটি গণিতের বিভিন্ন শাখার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক পরিশীলিত কাঠামো।
প্রথমত, মেশিন লার্নিংয়ের কেন্দ্রে রয়েছে রৈখিক বীজগণিত (Linear Algebra)। ডেটা সাধারণত ভেক্টর ও ম্যাট্রিক্স আকারে উপস্থাপিত হয়, আর মডেল শেখার প্রক্রিয়ায় এই ম্যাট্রিক্স অপারেশনই মূল ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ইমেজ রিকগনিশন সিস্টেম যখন কোনো ছবিকে শনাক্ত করে, তখন ছবির প্রতিটি পিক্সেল একটি সংখ্যায় রূপান্তরিত হয়ে একটি বৃহৎ ম্যাট্রিক্স তৈরি করে।
নিউরাল নেটওয়ার্কে ইনপুট থেকে আউটপুটে যাওয়ার প্রতিটি ধাপই মূলত ম্যাট্রিক্স গুণ, রূপান্তর এবং ভেক্টর অপারেশনের সমষ্টি। তাই রৈখিক বীজগণিত ছাড়া আধুনিক AI কল্পনাই করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, ক্যালকুলাস মেশিন লার্নিংয়ের শেখার প্রক্রিয়াকে সম্ভব করে তোলে। একটি মডেল কীভাবে নিজের ভুল কমাবে, তা নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হয় ডেরিভেটিভ ও গ্রেডিয়েন্ট। গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্ট নামের যে পদ্ধতি দিয়ে মডেল ধীরে ধীরে সর্বোত্তম সমাধানের দিকে এগোয়, তা আসলে ক্যালকুলাসের একটি প্রয়োগ। এই প্রক্রিয়ায় আমরা একটি ‘লস ফাংশন’ কমানোর চেষ্টা করি যা পরিমাপ করে মডেলের পূর্বাভাস বাস্তব ফলাফলের থেকে কতটা দূরে। গণিতের ভাষায় বলতে গেলে, এটি একটি অপ্টিমাইজেশন সমস্যা; আর এর সমাধানে ক্যালকুলাস অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, সম্ভাব্যতা ও পরিসংখ্যান মেশিন লার্নিংয়ের অনিশ্চয়তা বোঝার মূল হাতিয়ার। বাস্তব বিশ্বের ডেটা কখনই নিখুঁত নয়; এতে থাকে শব্দ (noise), অসম্পূর্ণতা ও অনিশ্চয়তা। সম্ভাব্যতার তত্ত্ব আমাদের শেখায় কীভাবে অনিশ্চিত ডেটা থেকে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বেয়েসিয়ান পদ্ধতি, হাইপোথেসিস টেস্টিং, রিগ্রেশন বিশ্লেষণ এসবই মেশিন লার্নিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একটি মডেল যখন কোনো ঘটনার সম্ভাবনা অনুমান করে, তখন সেটি মূলত পরিসংখ্যানগত অনুমানের ওপর নির্ভর করে।
চতুর্থত, অপ্টিমাইজেশন তত্ত্ব মেশিন লার্নিংয়ের দক্ষতা নির্ধারণ করে। একটি মডেলকে দ্রুত ও সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হলে কীভাবে সর্বোত্তম প্যারামিটার নির্বাচন করা যায় এই প্রশ্নের উত্তর দেয় অপ্টিমাইজেশন। কনভেক্স অপ্টিমাইজেশন, ল্যাগরেঞ্জ মাল্টিপ্লায়ার কিংবা রেগুলারাইজেশন কৌশল সবই গণিতের ধারণা, যা মডেলকে অতিরিক্ত শেখা (overfitting) থেকে রক্ষা করে এবং বাস্তব ডেটায় ভালো পারফর্ম করতে সাহায্য করে।
তবে গণিতের ভূমিকা শুধু প্রযুক্তিগত সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মেশিন লার্নিংয়ের দর্শনও নির্ধারণ করে। গণিত আমাদের শেখায় বিমূর্ত চিন্তা, যুক্তির শৃঙ্খলা এবং প্রমাণের সংস্কৃতি। এই বৈশিষ্ট্যগুলো AI গবেষণাকে একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেয়। যখন আমরা একটি নতুন অ্যালগরিদম তৈরি করি, তখন শুধু পরীক্ষামূলক ফলাফল নয় এর গাণিতিক বৈধতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, গণিত AI -কে শুধু কার্যকরই করে না, বিশ্বাসযোগ্যও করে।
একই সঙ্গে গণিত AI -এর সীমাবদ্ধতাও বুঝতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, ‘নো ফ্রি লাঞ্চ থিওরেম’ আমাদের বলে যে কোনো একক অ্যালগরিদম সব সমস্যার জন্য সমান কার্যকর হতে পারে না। আবার পরিসংখ্যানগত পক্ষপাত (bias) ও ভ্যারিয়েন্সের ভারসাম্য আমাদের শেখায় কেন একটি মডেল কখনও অতিরিক্ত সরল বা অতিরিক্ত জটিল হয়ে যায়। এসব ধারণা না বুঝলে AI -এর ফলাফল সহজেই বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
সমসাময়িক বিশ্বে গণিত ও AI -এর এই সম্পর্ক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা গণিতকে শুধু পরীক্ষার বিষয় হিসেবে দেখে, বাস্তব জীবনের প্রয়োগের সঙ্গে এর সংযোগ বোঝে না। কিন্তু মেশিন লার্নিং দেখিয়ে দিয়েছে, গণিতই ভবিষ্যতের প্রযুক্তির মূল ভাষা। তাই গণিত শিক্ষাকে আরও প্রাসঙ্গিক, প্রয়োগমুখী এবং অনুসন্ধানভিত্তিক করা জরুরি। প্রোগ্রামিং ও ডেটা বিশ্লেষণের সঙ্গে গণিতের সমন্বিত শিক্ষা শিক্ষার্থীদের নতুন যুগের জন্য প্রস্তুত করতে পারে।
অন্যদিকে, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই গাণিতিক ভিত্তির গুরুত্ব রয়েছে। AI -নির্ভর সিদ্ধান্ত যদি স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং বা বিচার ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়, তবে সেই মডেলের স্বচ্ছতা ও ব্যাখ্যাযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। গণিত এখানে একটি নিরপেক্ষ মানদণ্ড দেয়, যার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি একটি মডেল কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং কোথায় ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে গণিত শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিষয় নয়; এটি নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়- ভবিষ্যতে কি AI গণিতকে অপ্রয়োজনীয় করে দেবে? অনেকের আশঙ্কা, স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম সব সমস্যার সমাধান করে ফেললে মানুষের গাণিতিক দক্ষতার প্রয়োজন কমে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। যত উন্নত AI তৈরি হচ্ছে, ততই জটিল গাণিতিক কাঠামোর প্রয়োজন হচ্ছে। ডিপ লার্নিং, গ্রাফ নিউরাল নেটওয়ার্ক কিংবা কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং সব ক্ষেত্রেই নতুন গাণিতিক তত্ত্ব তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, AI গণিতকে প্রতিস্থাপন করছে না; বরং গণিতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
সর্বশেষে বলা যায়, গণিত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক একমুখী নয়; এটি পারস্পরিক। গণিত AI -কে ভিত্তি দেয়, আর AI গণিতকে নতুন সমস্যা ও সম্ভাবনার মুখোমুখি করে। এই সম্পর্ক ভবিষ্যতের জ্ঞানতত্ত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠছে। তাই AI -এর অগ্রযাত্রা বোঝার জন্য গণিতকে শুধু একটি সহায়ক বিষয় হিসেবে নয়, বরং মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে হবে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবের পেছনে কোনো না কোনো মৌলিক জ্ঞানভিত্তি কাজ করেছে শিল্পবিপ্লবের পেছনে ছিল পদার্থবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের পেছনে ছিল ইলেকট্রনিক্স ও লজিক। আর বর্তমান অও বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গণিত। তাই ভবিষ্যতের সমাজ, অর্থনীতি ও জ্ঞানচর্চা বুঝতে হলে আমাদের গণিতের এই গভীর ভূমিকা নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে। গণিতের বিমূর্ত সৌন্দর্য ও AI -এর বাস্তব প্রয়োগ এই দুইয়ের মিলনই হয়তো আগামী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বৌদ্ধিক ভিত্তি।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়