প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে যেকোনো দেশের নাগরিক সবচেয়ে গর্বের সঙ্গে যা বহন করতে পারেন, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাসপোর্ট। এটি শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয় বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও মর্যাদার বহিঃপ্রকাশ। একজন নাগরিক যখন বিদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন তার হাতে থাকা পাসপোর্টই সেই দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই পাসপোর্টের মান আসলে একটি দেশের সামগ্রিক অবস্থানের প্রতিফলন।
বিশ্বে বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবছর পাসপোর্টের শক্তিমত্তা নির্ধারণ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো Henley Passport Index, যা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স। ২০২৬ সালের জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ-এর পাসপোর্ট বিশ্ব তালিকায় ৯৫তম স্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালে এ অবস্থান ছিল ১০০তম। অর্থাৎ সামান্য উন্নতি হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনও অনেক দূরে। তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার ছোট রাষ্ট্র মালদ্বীপ ৫২তম অবস্থানে থেকে অনেক শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
এই সূচক মূলত নির্ধারণ করে একটি দেশের নাগরিক কতটি দেশে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা পান। অর্থাৎ একজন নাগরিককে কতটা সহজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়, সেটিই পাসপোর্টের শক্তির প্রধান মাপকাঠি। কিন্তু এর পেছনে আরও গভীর বাস্তবতা রয়েছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক পরিবেশ, আইনের শাসন, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং নাগরিকদের আচরণ- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক আস্থা তৈরি হয়। সেই আস্থাই শেষ পর্যন্ত পাসপোর্টের মান নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অবৈধ অভিবাসন। দীর্ঘদিন ধরে কিছু মানুষ দালালচক্রের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশের ঘটনা বহুবার সামনে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে অনেকেই মানবপাচারকারীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কেউ জিম্মি হয়েছেন, কারও কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে। এই মানবিক বিপর্যয় শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
শুধু শ্রম অভিবাসন নয়, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। অনেকে শিক্ষার্থী ভিসা বা ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফেরেন না। কেউ অন্য দেশে চলে যান, কেউ অবৈধভাবে অবস্থান করেন। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের বিষয়ে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করছে। বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদ, দীর্ঘ যাচাই-বাছাই, এমনকি ভিসা বাতিল- এসব ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ইস্যু ঘিরে বড় ধরনের জনসমাগম ও আন্দোলনের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অভিবাসননীতি আরও কঠোর করার দাবি জোরদার হয়েছে। এর প্রভাব পড়ে বৈধভাবে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী, গবেষক, পর্যটক ও পেশাজীবীদের ওপর। যারা সত্যিকার অর্থে উচ্চশিক্ষা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিদেশ যেতে চান, তারাও অতিরিক্ত সন্দেহ ও বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
একজন ভ্রমণপ্রেমী সম্প্রতি অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান, মালয়েশিয়ায় ভ্রমণে গিয়ে তাকে প্রায় তিন ঘণ্টা ইমিগ্রেশন জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোথায় থাকবেন, কতদিন থাকবেন, কবে ফিরবেন- এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের পরিচিত ট্রাভেল ব্লগার নাদির নিবরাস। যিনি নাদির অন দ্যা গো নামে বেশি পরিচিত। তিনি তার ইউটিউবে এক ভিডিও বার্তায় উল্লেখ করেন, তিনি এক বছরে ১৭টি দেশের জন্য ভিসা আবেদন করে ৭টি ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তার মতে, কিছু মানুষের ভিসার অপব্যবহারই এর অন্যতম কারণ। যখন কেউ ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে দেশে না ফেরেন বা অন্যত্র চলে যান, তখন সেই দেশের কর্তৃপক্ষ পরবর্তী আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে।
এমনকি এমন দেশও রয়েছে যাদের অর্থনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের তুলনায় দুর্বল, তারাও এখন ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি করছে। ভিসা প্রত্যাখ্যান মানে শুধু মানসিক আঘাত নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে আর্থিক ক্ষতিও। আবেদন ফি, নথিপত্র, টিকিট- সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ডেনমার্কের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অফার লেটার প্রদানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথা শোনা গেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পূর্বে কিছু শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। এ ধরনের ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুযোগও সংকুচিত করে।
বিশ্ব পাসপোর্ট সূচকে অবস্থান নিচের দিকে থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস পাসপোর্টধারীদের সম্পর্কে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই করতে পারে। ভিসা আবেদন বাতিল হওয়া, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা কিংবা সন্দেহের চোখে দেখা- এসবই নাগরিকদের জন্য অপমানজনক অভিজ্ঞতা। স্বাধীনতার জন্য বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত দেশের নাগরিকদের জন্য এটি সত্যিই গ্লানিকর।
বিশ্বায়নের যুগে মানুষের অবাধ চলাচল ক্রমেই একটি মৌলিক অধিকারের রূপ নিচ্ছে। জ্ঞান, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির আদান-প্রদান সহজতর হচ্ছে। সেখানে পাসপোর্টের কারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া আমাদের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত। তাই পাসপোর্টের মান উন্নয়ন শুধু কূটনৈতিক লক্ষ্য নয়; এটি জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন।
পাসপোর্ট সূচকে উন্নত অবস্থান পেতে হলে দেশের শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসনকে শক্তিশালী করতে হবে। দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষা আন্তর্জাতিক আস্থা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। আমরা যতই নিজেদের উন্নয়নের কথা বলি না কেন, আন্তর্জাতিক মূল্যায়নই শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। প্রবৃদ্ধির হার ইতিবাচক। অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু এসব সাফল্য বিশ্বমঞ্চে কতটা সঠিকভাবে তুলে ধরা যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উন্নয়নকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৃশ্যমান করতে না পারলে আস্থা তৈরি কঠিন।
একই সঙ্গে প্রয়োজন কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করা সম্ভব। পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। বৈধ পথে অভিবাসন, নিয়ম মেনে ভ্রমণ এবং নির্ধারিত সময় শেষে দেশে প্রত্যাবর্তন- এসবই আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক।
শেষ পর্যন্ত পাসপোর্টের মান শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিক- উভয়ের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা। আমরা যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেদের উন্নয়ন প্রমাণ করতে পারি, তবে শক্তিশালী পাসপোর্ট অর্জন অসম্ভব নয়। পাসপোর্টের মর্যাদা রক্ষা মানে দেশের মর্যাদা রক্ষা। আর সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন সুশাসন, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের চর্চা।
ওরাইনা খান চৌধুরী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়