ঢাকা রোববার, ২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদে নেই আমাদের সন্তানরা

রাকিবুল ইসলাম, লেখক ও সাংবাদিক
ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদে নেই আমাদের সন্তানরা

একটি অবুঝ শিশুর কান্না কিংবা তার নিথর-নিস্তব্ধ দেহ শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক বা দেয়ালঘেরা বেদনার গল্প নয়। এটি আসলে আমাদের সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থার চরম অবক্ষয় এবং রাষ্ট্রীয় ও সামষ্টিক ব্যর্থতার তীব্র এক প্রতিধ্বনি। যখন একটি নিষ্পাপ শৈশবকে ধর্ষণ ও হত্যার মতো চরম নৃসংসতায় পিষে ফেলা হয়, তখন শুধু একটি তাজা প্রাণই ঝরে যায় না, বরং মানবতা ও সভ্যতার বুকেও এক গভীর ও স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মহামারি যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা প্রতিটি নাগরিক ও অভিভাবককে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। শিশু আছিয়া, মাগুরার অবুঝ শিশু, ঠাকুরগাঁওয়ের ৪ বছরের লামিয়া, সিলেটের ফাহিমা কিংবা ঢাকার পল্লবীর ৭ বছরের ছোট্ট রামিসা নির্দোষ ও নিষ্পাপ শিশুদের ওপর একের পর এক অমানবিক বর্বরতা আজ পুরো সমাজকে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

পরিসংখ্যানের নিষ্ঠুর বাস্তবতা : ১৬ মাসে ৫৮০ শিশু ধর্ষণ, নিহত ৪৮৩। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত সর্বশেষ গা শিউরে ওঠা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেশে শিশু সুরক্ষার কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত হয়। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিগত ১৬ মাসে দেশে অন্তত ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু ও কিশোরী চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের ভেতরের উপাত্তগুলো আরও ভয়াবহ। নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড : এই ১৬ মাসে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ৪৮৩ জন শিশুকে। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন : অন্তত ৫৮০টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং আরও ৩১৮ জন শিশু শিকার হয়েছে ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন: ১ হাজার ৪০৭ জন শিশু প্রত্যক্ষ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে গেছে। এই তথ্যগুলো কেবল গণমাধ্যমে প্রকাশিত বা নথিবদ্ধ হওয়া ঘটনার সংখ্যা।

লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ ও প্রভাবশালীদের হুমকিতে ধামাচাপা পড়ে যাওয়া ঘটনার সংখ্যা হিসাব করলে বান্তব চিত্রটি আরও বহুগুণ বেশি হবে।

লাশের মিছিল ও চূর্ণবিচূর্ণ বিশ্বাসের দেয়াল : অপরাধের এই কালো থাবা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া আজ যেন শিশুদের জন্য এক অবরুদ্ধ অভয়ারণ্য। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এই হিংস্রতার থাবা আজ ঘরের বাইরে যতটা, ঘরের ভেতরেও ঠিক ততটাই। ঘটনাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটছে শিশুর পরিচিত পরিমণ্ডলে এবং অতি সাম্প্রতিক সময়ে এর বীভৎসতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

কেবল ২০২৬ সালের মে মাসের দিকে তাকাইলেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। পল্লবী, ঢাকা (১৯ মে ২০২৬): দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ৭ বছর বয়সি শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সিরাজদিখান, মুন্সিগঞ্জ (১৬ মে ২০২৬) : চান্দের চর গ্রামের মদিনাপাড়ায় আছিয়া আক্তার (১০) নামে এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। রাণীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও (১৪ মে ২০২৬) : নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর স্থানীয় একটি ভুট্টাখেত থেকে উদ্ধার করা হয় ৪ বছরের শিশু লামিয়া আক্তারের লাশ। সিলেট সদর (৬ মে ২০২৬) : জালালাবাদ এলাকায় চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণচেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

এর আগে মাগুরায় ৮ বছরের শিশু, নেত্রকোনায় মাদ্রাসা শিক্ষকের দ্বারা ১১ বছরের শিশু এবং সাতক্ষীরায় ৬ বছরের শিশু মসজিদের ইমাম দ্বারা বিস্কুটের প্রলোভনে ধর্ষণের শিকার হয়। একটা সময় ভাবা হতো, সন্তানকে আগলে রাখতে ঘরের চার দেওয়ালই সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। কিন্তু বর্তমান সামাজিক অবক্ষয় ও মানবিকতার নগ্ন রূপ সেই বিশ্বাসকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। যে ধর্মীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ আশ্রয় ভাবা হতো, কিংবা যে বাড়ির আঙিনায় শিশুরা খেলত সেখানেও হানা দিয়েছে নৃশংসতা ও হিংস্রতা। বিশ্বাসের জায়গাগুলোই এখন সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতির দুটি রূপ রয়েছে একটি প্রত্যক্ষ, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সহ্য করছে; অন্যটি পরোক্ষ, যা পুরো সমাজের মনস্তত্ত্বকে বিষিয়ে তুলছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের চিরস্থায়ী ট্রমা ও অবিশ্বাস: একটি শিশু যখন এই ধরনের নৃশংসতার শিকার হয়, তখন পুরো পরিবারটি জীবন্ত লাশে পরিণত হয়। সন্তানহারা রামিসার পিতা যখন চরম ক্ষোভ আর বুকফাটা হাহাকার নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমরা বিচার চাই না, এদেশে বিচার নাই! আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।’ তখন বুঝতে হবে বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস এখন শূন্যের কোটায়।

সামাজিক আতঙ্ক ও অবরুদ্ধ শৈশব : এই নিষ্ঠুরতা শুধু নির্দিষ্ট পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা পুরো সমাজের মা-বাবাদের মনে এক গভীর মানসিক ট্রমা তৈরি করছে। বিশেষ করে কন্যা সন্তানের মায়েরা যে কী পরিমাণ আতঙ্কে ভুগছেন, তা প্রকাশ পেয়েছে নাটোরের এক মায়ের আকুলতায়। তিনি গণমাধ্যমের সামনে ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন, ‘আজকে সকাল বেলা ফজরের নামাজ পড়ে আল্লাহকে বলছি যে আল্লাহ, কারো ঘরে আর কন্যা সন্তান দিও না। কারণ এই কষ্টটা সহ্য করার মতো নয়।

আমার বাচ্চাটাকে আমি যে বাইরে পাঠাচ্ছি, আমার এখন মনে প্রচণ্ড শঙ্কা।’ আজ শিশুরা ঘরের বাইরে তো দূরের কথা, ঘরের ভেতরে পরিচিত মানুষের পাশেও নিরাপদ বোধ করছে না। শৈশব আজ চার দেয়ালের খাঁচায় বন্দি। সমাজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওপেন নেট দুনিয়া বা ইন্টারনেটের অপব্যবহার, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং মাদকের লাগামহীন বিস্তার এই বিকৃত মানসিকতা তৈরিতে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

১৬৪ ধারার জবানবন্দি বনাম বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা : ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করার পর অপরাধী হাতেনাতে ধরা পড়ছে। শুধু তাই নয়, প্রশাসনের কাছে এবং আদালতে নিজের মুখে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিচ্ছে! যেখানে অপরাধ এবং অপরাধী দুটোই কাচের মতো স্পষ্ট, সেখানেও কেন নির্মম ও নৃশংসভাবে ধর্ষণ এবং হত্যাকান্ডের শিকার নিষ্পাপ শিশুর পরিবার বছরের পর বছর ধরে ন্যায়বিচারের জন্য আদালতের বারান্দায় ঘুরছে? কেন এই চরম বিলম্ব? নৃশংসতার সব প্রমাণ আছে, অপরাধীর নিজের মুখের স্বীকারোক্তি আছে তারপরেও ন্যায়বিচারে কেন এই বিলম্ব হবে? আইনের এই ধীর গতি, তদন্তের দুর্বলতা এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া মূলত অপরাধীদের মনে এক ধরনের ‘অভয় অরণ্য’ বা পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করে। ন্যায়বিচার সময়মতো না হলে অন্য সম্ভাব্য অপরাধীরাও আশকারা পেয়ে যায় এবং অন্যায়ের সাহস সমাজে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। বহু চাঞ্চল্যকর মামলার আসামিরা আইনি ফাঁকফোকর গলিয়ে জামিনে বেরিয়ে এসে এলাকায় বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়, যা একটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য চরম আত্মগ্লানির।

আজ যে শিশুটি হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো, তার বাবা হয়তো দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আইন নিজের হাতে তুলে নেননি। কিন্তু রাষ্ট্র যদি তাকে বছরের পর বছর ঘুরিয়েও শেষ পর্যন্ত সঠিক বিচার না দিতে পারে আর প্রকাশ্যে সন্তানের ধর্ষণকারী ও খুনি বুক ফুলিয়ে ঘুড়ে বেড়ায়, তবে এই নীরবতা একদিন ভয়ংকর রূপ নেবে। বিচারহীনতার এই ধারা চলতে থাকলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অভিভাবকরা অপরাধীদের প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়ার জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হবেন যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। যখন এই লেখাটি লিখছি, তখন বার বার নিজের দুই কন্যাসন্তানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাচ্ছি। একজনের বয়স সাত বছর, আরেকজনের মাত্র দুই বছর। বর্তমান বাংলাদেশের এই সামাজিক পরিস্থিতি দেখে আমার মতো প্রতিটি অভিভাবক আজ চরম চিন্তিত ও শঙ্কিত। কোন সমাজে বড় হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা? ওদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি আজ কে দেবে? রাষ্ট্র, সমাজ নাকি পরিবার? এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ পৃথিবী দিতে হলে কেবল মোমবাতি জ্বালানো বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই চলবে না। রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থাকা মামলাগুলোর ক্ষেত্রে কোনো অজুহাত বা বিলম্ব না করে, বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অবিলম্বে এই নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক ও দৃশ্যমান ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের জামিন অযোগ্য আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কঠোর ও যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা (কাউন্সেলিং) নিশ্চিত করতে হবে। বিকৃত মানসিকতা বিস্তারের মূল উৎস পর্নোগ্রাফির সাইটগুলো স্থায়ীভাবে ব্লক করা এবং মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসনকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাড়ায়-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে। অপরাধী কোনো জাতি, গোষ্ঠী বা দলের যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে সামাজিকভাবে পুরোপুরি বয়কট করতে হবে। একই সাথে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।

আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বা অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া দেশ হয়তো মেনে নিতে পারব, কিন্তু একটি নৈতিকভাবে দেউলিয়া ও অনিরাপদ দেশ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নিষ্পাপ আছিয়া, লামিয়া, ফাহিমা তারপর রামিসা... আগামীকাল তাহলে কার কলিজার টুকরার পালা? আজ যদি আমরা রামিশা, আছিয়া, লামিয়া কিংবা ফাহিমার হত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে না পারি, তবে আগামী দিনে আর কোনো সন্তানের নিরাপত্তা আমরা দিতে পারব না। ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের পুরো প্রজন্মকে তখন অপরাধী হয়ে দাঁড়াতে হবে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের এখন প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং অভিভাবকদের এই চিরস্থায়ী আতঙ্ক দূর করে শিশুদের জন্য ঘরের ভেতরে ও বাইরে একটি মুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত