ঢাকা রোববার, ২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মহাজাগতিক চেতনার রূপক বনলতা

আমানুর রহমান, কবি ও লেখক, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ
মহাজাগতিক চেতনার  রূপক বনলতা

জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি পড়ার সময় আমাদের চোখের সামনে চিরায়ত এক রহস্যময়ী নারীর মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু সাধারণ পাঠের সীমানা পেরিয়ে যদি আমরা একটু গভীরে দৃষ্টি দিই, তবে উপলব্ধি করব এক বিস্ময়কর সত্য। বনলতা সেন শুধু রক্ত-মাংসের কোনো নারী চরিত্র নন, তিনি আসলে এক ‘কসমিক সিঙ্গুলারিটি’ বা মহাজাগতিক চেতনা।

মানুষের জীবনে, চারপাশের কোলাহল আর যান্ত্রিক বাস্তবতার ভিড়ে এমন একটি স্থির বিন্দুর প্রয়োজন হয়, যেখানে পৌঁছালে সমস্ত অস্থিরতা শান্ত হয়ে আসে। দর্শনের ভাষায়, বনলতা সেন কোনো সাধারণ নারী বা প্রেমিকা নন; তিনি হলেন ক্লান্ত মানবাত্মার সেই ‘পরম আশ্রয়’। বস্তুজগৎ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে এক মহাজাগতিক প্রশান্তির দিকে মানুষের অন্তহীন যাত্রার আখ্যান লুকিয়ে আছে এই কবিতায়।

জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী কবিতা ‘বনলতা সেন’-এ আমরা দুটি ভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির দেখা পাই- ম্যাক্রো-ভিউ (সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ) এবং মাইক্রো-ভিউ (ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ)। কবি যখন বলেন, ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’, তখন তা কোনো একক ব্যক্তির নিছক প্রাত্যহিক ভ্রমণ থাকে না।

এটি হয়ে ওঠে মানবসভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের বেঁচে থাকার, চেনা-অচেনা অসংখ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়ার এক অন্তহীন ও ক্লান্তিকর যাত্রার দার্শনিক রূপক। কিন্তু বিবর্তনের এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ধারাবাহিকতায় একসময় যেন সমগ্র পৃথিবীর পরমাণুগুলো সংকুচিত হয়ে বনলতা সেনের সত্তায় রূপান্তরিত হয়। দীর্ঘ ম্যাক্রো যাত্রার পর কবি নাটোর নামক একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে স্থির হন। সেখানে নারীর মুখের এক চিলতে জিজ্ঞাসা- ‘এতদিন কোথায় ছিলে?’-কবির হাজার বছরের পুঞ্জীভূত ক্লান্তি ধুয়ে দেয়। এটি হলো কবিতার মাইক্রো-ভিউ, যেখানে সুবিশাল জগৎ ছোট হয়ে শুধু দুটি মানুষের চেতনায় এসে পূর্ণতা পায়।

বনলতা যে কখনও সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে কবিতার উপমাগুলোতে। ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,/মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য’-জীবনানন্দের এই দুটি লাইন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী পরাবাস্তববাদী বা সুরিয়ালিস্টিক উপমা। একজন সাধারণ বাস্তববাদী কবি নারীর রূপ বর্ণনায় ‘মেঘের মতো কালো চুল’ বা ‘চাঁদের মতো মুখ’ ব্যবহার করেন, যা আমাদের চোখ সরাসরি দেখতে পায় এবং যুক্তি সহজেই গ্রহণ করে। কিন্তু জীবনানন্দ যখন চুলকে ‘বিদিশার নিশা’ এবং মুখকে ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ বা পাথরের ভাস্কর্যের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন তিনি চোখের দেখার জগৎ পেরিয়ে অনুভূতির এক গভীর জগতে প্রবেশ করেন। মানুষের চোখ দিয়ে কোনো নারীর চুলে প্রাচীন নগরীর হাজার বছর আগের অন্ধকারকে দেখা অসম্ভব। এই পরাবাস্তববাদ সাধারণ যুক্তিকে চূর্ণ করে দেয়, যা আমাদের আধুনিক বিজ্ঞানের কোয়ান্টাম ফিজিক্সের ‘সুপারপজিশন’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে একটি কণা একই সঙ্গে একাধিক স্থান ও কালে অবস্থান করতে পারে।

কবি বনলতাকে কোনো নির্দিষ্ট স্থান, কাল বা রক্ত-মাংসের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রাচীন ভারতের এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল বিদিশা।

কবি নারীর চুলের কালো রং বোঝাতে শুধু ‘কালো’ শব্দটি ব্যবহার না করে, তাকে নিয়ে গেছেন ইতিহাসের অতল অতীতে- হারিয়ে যাওয়া নগরীর রহস্যময় অন্ধকারের ভেতর। অন্যদিকে, শ্রাবস্তী ছিল বৌদ্ধ সভ্যতার এক বিখ্যাত কেন্দ্র, যা তার সূক্ষ্ম শিল্পকলা ও পাথরের খোদাই করা ভাস্কর্যের জন্য অবিস্মরণীয়। নারীর মুখের অবয়বকে কবি সেই প্রাচীন শহরের পরম মমতায় গড়া ভাস্কর্যের সঙ্গে একাকার করেছেন। এখানেই কবি বিদিশা ও শ্রাবস্তীর মতো দুটি ঐতিহাসিক স্থান এবং অন্ধকারের মতো একটি বিমূর্ত ধারণাকে টেনে এনে নারীর শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।

নারী এখানে আর শুধুই একজন ব্যক্তি থাকেন না, তিনি স্বয়ং ইতিহাস ও আদিম প্রকৃতির এক রহস্যময় রূপ হয়ে ওঠেন।

কবিতার শেষ স্তবকে এসে এক অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক সমীকরণের জন্ম হয়। চারপাশের চিরচেনা বস্তুজগৎ যেন পুরোপুরি হাওয়া হয়ে যেতে থাকে। সব পাখি ঘরে আসে, নদী ফুরিয়ে যায়, জীবনের সব লেনদেন শেষ হয়। কবিতাটি যেন একটি বিন্দুর মতো সংকুচিত হয়ে এক পরম অন্ধকারে প্রবেশ করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় মহাবিশ্বের ‘এন্ট্রপি’ বা বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো। মানুষের ইতিহাস ও সভ্যতার বয়স যত বাড়ছে, জীবনীশক্তি বা এনার্জি তত ক্ষয় হচ্ছে। যখন সব শক্তি ফুরিয়ে যায়, প্রকৃতির সমীকরণ অনুযায়ী সবকিছু স্থবির হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু জীবনানন্দ সেখানে শূন্যতার বদলে এক মহাজাগতিক সমীকরণ দাঁড় করান, যেখানে সমগ্র মহাবিশ্বজুড়ে শুধু দুটি বাস্তবতা বিদ্যমান থাকে- অসীম অন্ধকার এবং বনলতা নামক ‘কসমিক কনশাসনেস’। চূড়ান্ত এই অবস্থায় মহাজাগতিক সমীকরণটি দাঁড়ায় ঠিক এমন :

Total Universe= Absolute Darkness + CBanalata.

যখন বস্তুজগতের সবকিছু শূন্য হয়ে যায়, তখন সমীকরণের একপাশে থাকে শুধু পরম অন্ধকার আর অন্যপাশে থাকে মানুষের অবিনশ্বর চেতনা (C)। জীবনানন্দ দাশ যেন আমাদের এই শিক্ষাই দেন যে, জগতে সবকিছুই ক্ষয়িষ্ণু এবং ধ্বংসশীল; কিন্তু মানুষের প্রেম, আশ্রয় এবং শুদ্ধ চেতনা ভৌত বা ফিজিক্যাল জগতের সমস্ত ধ্বংস ও অন্ধকারের ওপারেও টিকে থাকতে পারে অনাদিকাল ধরে। ধ্বংসশীল মহাবিশ্বের এই শূন্যতার সমীকরণে বনলতা সেন হলেন সেই একমাত্র ধ্রুবক, যিনি মহাজাগতিক অন্ধকারকেও এক অসীম পূর্ণতা দান করেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত