ঢাকা শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ছে ফেনীর মুহুরী প্রজেক্ট

পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ছে ফেনীর মুহুরী প্রজেক্ট

পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ফেনীর মুহুরী প্রজেক্ট। এখানকার মনকাড়া সৌন্দর্য সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য। দেশের প্রথম বায়ু-বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও এখানেই অবস্থিত। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে এটি। এখানকার সৌন্দর্য দেখতে পুরো বছরই দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। বিশেষ করে ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় হয় ভ্রমণ পিপাসুদের ।

জেলার সোনাগাজী উপজেলায় অবস্থিত এ সেচ প্রকল্প কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশাল অবদান রাখার পাশাপাশি একটি অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ ও এর পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক অনাবিল নৈসর্গিক শোভা যেকোনো পর্যটককে মুহূর্তেই আকর্ষিত করবে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মুহুরী রেগুলেটরের চারদিকে বাঁধ দিয়ে ঘেরা কৃত্রিম জলরাশি, বনায়ন, মাছের অভয়ারণ্য, পাখির কলকাকলি, বাঁধের দু’পাশে নিচ থেকে পাথর দিয়ে বাঁধানো ও ওপরদিকে দূর্বা ঘাসের পরিপাটি বিছানা। জলরাশিতে নৌ ভ্রমণের সময় খুব কাছ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস ও প্রায় বিভিন্ন জাতের শত শত পাখির দেখা মেলে।

এছাড়া নদী পাড়ের সবুজ বনানী ঘেরা মায়াবী পরিবেশ। অতিথি পাখির আগমন ও তাদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এই এলাকা। গরমে একেটু স্বস্তির বাতাসের জন্যও মানুষ এখানে ছুটে আসেন। আরও রয়েছে সেচ প্রকল্প এলাকার চারপাশে সবুজের সমারোহ।

এখানে পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদার করতে স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ ফাঁড়ি। মুহুরী নদীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভাসমান মাছ চাষ, নদীতে জাল ফেলে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য, দেশের প্রথম বায়ু-বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ, ডেইরি ফার্ম, ব্যক্তিগত পর্যায়ে নার্সারি, অ্যাগ্রো খামার ইত্যাদি দেখে আপনার চোখ জুড়াবে।

এক সময় মুহুরী প্রকল্পের স্থানে ছিল প্রায় ২ মাইল প্রশস্থ নদী। এপার-ওপার ছিল বিচ্ছিন্ন। ফেনী নদী ও মুহুরী নদীর দুই তীরকে সেচ সুবিধার আওতায় এনে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশে ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার সীমান্ত বরাবর বয়ে যাওয়া ফেনী নদী ও মুহুরী নদীর মোহনার কিছুটা ভাটিতে নির্মিত এ মুহুরী সেচ প্রকল্প।

মুহুরী প্রকল্পের অধীনে আছে ফেনী সদর, সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম থানার আংশিক ও মিরসরাই থানার উত্তরাঞ্চলের বিশাল এলাকা।

মুহুরী প্রকল্পে নির্মাণ কাজ ১৯৭৭-৭৮ সালে শুরু হলেও এর প্রাথমিক কাজ শেষ হতে সময় লাগে ৩ বছর। আর সম্পূর্ণ কাজ শেষ হতে ১৯৮৫-৮৬ সাল পার হয়ে যায়। প্রকল্পের প্রধান অংশগুলো হচ্ছে ইমারত ৭ হাজার ৬৪৬ বর্গমিটার, ক্লোজার ড্যাম ১টি ৩ হাজার ৪১১ কিলোমিটার। রেগুলেটর একটি ৪০ দরজা বিশিষ্ট নিষ্কাশন কাঠামো নতুন একটি ও পূর্ণ সংস্কার ৬টি।

প্রকল্পাধীন এলাকার আয়তন ৪০ হাজার ৮০ দশমিক ৯২ হেক্টর। তার মধ্যে প্রায় ২৩ হাজার ৭৬ দশমিক ৯৩ হেক্টর ফসলি জমি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বার্ষিক অতিরিক্ত ফসল উৎপাদিত হয় ৮৫ হাজার মেট্টিক টন। মুহুরী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে খরচ হয় ৯৫ হাজার ৬৮ হাজার ৬২৪ লাখ টাকা।

প্রকল্প পরিচালনায় বর্তমানে কর্তৃপক্ষের বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ভর্তূকির পরিমাণ ২১ হাজার ৩১৮ লাখ টাকা। আয় ব্যায়ের বার্ষিক হিসেবে লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় শতকরা ৩২ দশমিক ১৩।

দর্শনার্থীদের জন্য অন্যতম প্রধান আকর্ষণ চল্লিশ দরজা বিশিষ্ট সারিবদ্ধ রেগুলেটর। এছাড়া বাঁধের মূলগোড়া থেকে প্রকল্পে প্রবেশ না করে বেড়িবাঁধ দিয়ে সোজা দক্ষিণে গেলেই দেখবেন উপকূলীয় বনবিভাগ কর্তৃক সাজানো কৃত্রিম সুন্দরবন। বনের ফাঁকে ফাঁকে সর্পিল আকারে বয়ে গেছে ছোট ছোট নদী ও অনেক বন্য পশুপাখি।

দেশের যেকোনো স্থান থেকে মুহুরী প্রজেক্টের সড়ক যোগাযোগ তথা যাতায়াত ব্যবস্থা যথেষ্ট সুবিধাজনক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ বাজারের উত্তর পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি পশ্চিম দিকে চলে গেছে। সেটিই সহজতর ও একমাত্র রাস্তা। জোরারগঞ্জ হতে প্রজেক্ট পর্যন্ত মাত্র আধা কিলোমিটার রাস্তাতেই পাবেন সিএনজি বা অটোরিকশা সার্ভিস।

ভাড়া টেক্সি বা ব্যক্তিগত গাড়িতেই ভ্রমণ সুবিধাজনক হয়। একাকি কিংবা দলবদ্ধভাবে মুহুরী প্রজেক্টে ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারেন। জোরারগঞ্জ হতে প্রজেক্ট রোডে আট কিলোমিটার চলার পর প্রকল্পের দীর্ঘ ড্যামের (বাঁধের) পূর্ব প্রান্তে পৌঁছানো যাবে।

ফাঁকে ফাঁকে বিক্ষিপ্ত কয়েকটি রেস্টুরেন্ট তাই নিজ দায়িত্বেই খাবারের আয়োজনের জন্যে রেগুলেটরের উত্তর পশ্চিমের ছোট বনে রান্না-বান্না ও ভোজের আয়োজন করা যেতে পারে। দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে ২/১টি অস্থায়ী ভাসমান চা দোকান বসে। তবে সেখানে রাতযাপনের কোনো সুব্যবস্থা নেই।

দর্শনার্থী ওমর ফারুক জানান, এই এলাকাটি পযর্টকদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ভ্রমণ পিপাসুদের আগমন ঘটে। তবে রাতে থাকার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়নে মুহুরী প্রজেক্ট একটি আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। যা থেকে কর্পোরেশন প্রতিবছর পর্যটন খাতে আয় করতে পারে দেশি-বিদেশি বৈদেশিক মুদ্রা।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বা ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাদের সদিচ্ছার অভাবে কাঙ্খিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি এটি। এছাড়া থাকাণ্ডখাওয়ার সুব্যবস্থার অভাবে নিরাশ হতে হয় অনেক পর্যটককে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আধুনিক একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে কোটি টাকা রাজস্ব আয় হবে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত