
পৃথক সাত মামলায় জামিনের পর এবার সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে নতুন করে যাত্রাবাড়ী থানার একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গতকাল শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হকের আদালত এই আদেশ দেন। এর ফলে তার জামিনে মুক্তি আটকে গেল বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী। ১৬ মে এ মামলায় খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছিলেন যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক মো. ইব্রাহিম খলিল।
গতকাল শনিবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটে আদালতের হাজতখানা থেকে সাবেক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে হুইলচেয়ারে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তাকে হাতকড়া, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরানো ছিল। ১০ মিনিট পর তাকে আদালতে উঠিয়ে কাঠগড়ার পাশে হুইলচেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়। এ সময় হাতকড়া ও হেলমেট খুলে দেয় পুলিশ। বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটের দিকে তাকে আবার আদালত থেকে সিএমএম কোর্টের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বেলা তিনটার দিকে তাকে আবার আদালতে আনা হয়।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, সাবেক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন্যতম সহযোগী ছিলেন। শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হতে আইনিভাবে সহযোগিতা করেছেন তিনি। জুলাই আন্দোলন চলাকালে যাত্রাবাড়ীতে খোয়াইব নামের একজনকে হত্যা করা হয়। সেই হত্যা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা এই আসামির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন। কেউ কেউ এর বিরোধিতা করতে পারে, কিন্তু এটাও সত্য যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হয়েও অনলাইনে বা জুম মিটিংয়ে বা বার্তার মাধ্যমে বিভিন্ন অপকর্মের নির্দেশ দেওয়া যায়। সেটিই করেছেন খায়রুল হক।
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান তার মক্কেলকে গ্রেপ্তার না দেখানোর আবেদন করে বলেন, ওনাকে (এ বি এম খায়রুল হক) শোন অ্যারেস্ট দেখানোর আবেদন এসেছে যাত্রাবাড়ী থানার। ঘটনার সময় বলা হচ্ছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বেলা ১১টা। এই একই অভিযোগ এসেছে আদাবর থানার একটি হত্যা মামলায়ও। একই আসামি একই সময়ে তো দুই জায়গায় থাকতে পারেন না। ওনার বয়স এখন ৮২। তদন্ত কর্মকর্তার জানা উচিত একজন বৃদ্ধ এভাবে অকারেন্স করতে পারেন না। ওনার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোন চার্জশিট দাখিল হয়নি।
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, একই সময়ে একাধিক জায়গায় হত্যায় সংশ্লিষ্ট থাকা যায়। নির্দেশ দেওয়া যায়। এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা যদি আসামির সংশ্লিষ্টতা পান, তাহলে তো এটা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত বেলা ৩টা ৩৩ মিনিটে খায়রুল হককে গ্রেপ্তারের আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। শুনানি চলাকালে পুরো সময় হুইলচেয়ারে চুপ করে বসে ছিলেন খায়রুল হক।
শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের অন্য আইনজীবী মোনাইম নবী শাহিন বলেন, ‘আজকের এই আদেশ আদালত অবমাননার শামিল। হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আগেই। কিন্তু সেই আদেশ অমান্য করে আজ আবার তাকে অষ্টম মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তার জামিনে মুক্তি আটকে গেল আবার।’
এই মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে যাত্রাবাড়ী পদচারী সেতুর নিচে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন খোয়াইব। বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে যাত্রাবাড়ী মোড়ের দিকে অগ্রসর হন। শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিদের নির্দেশ ও মদদে পুলিশ, র্যাবসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের অস্ত্রধারীরা আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত গুলি চালায়। এতে গুরুতর আহত হন খোয়াইব। তাকে গুরুতর অবস্থায় স্থানীয় লোকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর নিহত খোয়াইবের ভাই জোবায়ের আহম্মেদ বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে শেখ হাসিনাসহ ৮০ জনকে আসামি করা হয়।
গত বছরের ২৪ জুলাই সকালে ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর তাকে আজসহ একে একে আটটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়।