
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রাম। ফসলের সবুজ মাঠ যেখানে দিগন্ত ছুঁয়েছে, সেখানেই এক ব্যতিক্রমী কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেছেন কৃষক ইসমাইল হোসেন। প্রথাগত চাষাবাদের বাইরে গিয়ে আধুনিক ও লাভজনক পদ্ধতির সমন্বয়ে তিনি একই জমিতে যুগপৎ আবাদ করছেন ভুট্টা ও ধনিয়া। মাত্র ৩০ শতক জমিতে তার এই ‘সাথী ফসল’ বা মিশ্র চাষের উদ্যোগ এখন এলাকার অন্য কৃষকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতের বসন্তের আগমনে মাঠ যখন হলদেটে হতে শুরু করে, ঠিক সেই সময়ে ইসমাইল হোসেনের জমিতে দেখা যায় সবুজের এক অপরূপ সমারোহ। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে সতেজ ভুট্টার চারা, আর সেই চারাগুলোর মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সুগন্ধি ধনিয়া পাতা। কৃষিতে এই নতুন পদ্ধতির নাম মিশ্র চাষ বা ইন্টারক্রপিং। ইসমাইল হোসেন জানান, গতানুগতিক ধারায় শুধু একটি ফসল চাষ করলে যে পরিমাণ শ্রম ও ব্যয় হয়, তাতে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি এই মৌসুমে তার ৩০ শতক জমিতে মূল ফসল হিসেবে ভুট্টার চারা রোপণ করেন। কিন্তু ভুট্টার চারা যখন ছোট থাকে, তখন দুই সারির মাঝখানে অনেকটা জায়গা পড়ে থাকে। সেই জায়গাকে কাজে লাগিয়ে তিনি সেখানে ধনিয়ার বীজ বপন করেন।
সাথী ফসল হিসেবে ধনিয়া চাষের বড় সুবিধা হলো এর স্বল্পমেয়াদি জীবনচক্র। ভুট্টা যখন বড় হয়ে ছায়া দিতে শুরু করে, তার আগেই ধনিয়া বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে যায়। এতে মূল ফসলের কোনো ক্ষতি তো হয়ই না, বরং বাড়তি লাভ আসে কৃষকের হাতে। ইসমাইল হোসেনের জমিতে গিয়ে দেখা যায়, ভুট্টার গাছগুলো এখন বেশ স্বাস্থ্যবান। আর মাটির বুক চিরে উঠে আসা ধনিয়ার গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। তিনি জানান, একই জমিতে পানি, সার এবং নিড়ানি দেওয়ার ফলে আলাদা করে ধনিয়ার জন্য তেমন কোনো খরচ করতে হয়নি তাকে। ভুট্টার যত্ন নিতে নিতেই ধনিয়া বেড়ে উঠেছে আপন গতিতে।
কৃষক ইসমাইল হোসেনের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত মেহার গ্রামের অন্য কৃষকরাও। স্থানীয়রা বলছেন, আগে অনেকেই মনে করতেন একই জমিতে একাধিক ফসল চাষ করলে ফলন কমে যেতে পারে। কিন্তু ইসমাইলের খেতের চিত্র দেখে সেই ভুল ধারণা ভাঙতে শুরু করেছে। তার ৩০ শতক জমি থেকে ভুট্টা উত্তোলনের আগেই তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা আয় করতে পারবেন শুধু ধনিয়া বিক্রি করে। বর্তমান বাজারে ধনিয়া পাতার চাহিদা প্রচুর থাকায় তিনি সরাসরি মাঠ থেকেই পাইকারি দরে এই ফসল বিক্রি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ভুট্টা থেকে প্রাপ্ত ফলন ও গো-খাদ্য হিসেবে গাছের উপযোগিতা তার আয়ের পাল্লাকে আরও ভারী করবে।
এই চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষিবিদদের মত হলো, সাথী ফসল চাষ করলে জমির উর্বরতা বজায় থাকে এবং আগাছার উপদ্রব কম হয়। বিশেষ করে ভুট্টার মতো দীর্ঘমেয়াদি ফসলের সঙ্গে ধনিয়ার মতো স্বল্পমেয়াদি ফসলের চাষ অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঝুঁকি কমে এবং জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। ইসমাইল হোসেনের এই উদ্যোগটি চান্দিনা উপজেলার কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে যদি মেধা ও আধুনিক কৌশলের সমন্বয় ঘটানো যায়, তবে অল্প জমি থেকেও দ্বিগুণ লাভ করা সম্ভব।
ইসমাইল হোসেনের এই সাফল্যের গল্প এখন শুধু মেহার গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরাও তার খেত দেখতে আসছেন এবং পরামর্শ নিচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে যদি এ ধরনের উদ্ভাবনী কৃষকদের আরও বেশি উদ্বুদ্ধ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের কৃষি খাতে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব। সূর্যাস্তের আলোয় যখন ইসমাইল হোসেন তার খেতের আইলে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির হাসি হাসেন, তখন তা শুধু একজন কৃষকের ব্যক্তিগত হাসি থাকে না; তা হয়ে ওঠে সমৃদ্ধ কৃষির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।