
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আগামী ১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত মধু আহরণ মৌসুম। এরইমধ্যে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় মৌয়ালদের নৌকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। বনবিভাগের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বনবিভাগ জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৮৫৪ দশমিক ৫ কুইন্টাল মধু ও ২৭৫ দশমিক ৫ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করা হয়েছিল। ওই সময় ২৪৮টি পাশের মাধ্যমে ১ হাজার ৭০৯ জন মৌয়াল বনে প্রবেশ করেছিলেন। প্রতিবছরের মতো এবারও সুন্দরবনের বিভিন্ন রেঞ্জে পর্যায়ক্রমে মৌয়ালদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। নির্ধারিত পারমিট নিয়ে দলবদ্ধভাবে তারা গভীর বনে প্রবেশ করে প্রাকৃতিক চাক থেকে মধু সংগ্রহ করবেন। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা এলাকার মৌয়াল দলনেতা আব্দুর রাজ্জাক জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। ১২ জনের একটি দল গঠন করেছি। ১ এপ্রিল পাস নিয়ে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে যাব। সুন্দরবনের মধু প্রাকৃতিক ও ভেজালমুক্ত হওয়ায় এর চাহিদা অনেক। তবে মধু আহরণে জীবনের ঝুঁকি কম নয়। বনের ভেতরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বিষধর সাপসহ নানা বন্যপ্রাণী ও প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয় মৌয়ালদের।
বুড়িগোয়ালিনী এলাকার মৌয়াল শাহাজান সরদার জানান, গত বছর মধু খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ বাঘের মুখোমুখি হয়েছিলাম। চিৎকার করলে সহযোগীরা এসে গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে বাঘটি পিছু হটাতে সক্ষম হয়। জীবন ঝুঁকিতে নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়।
বনবিভাগ জানিয়েছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বনজসম্পদ রক্ষায় নির্ধারিত নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে চাক ধ্বংস বা অতিরিক্ত আহরণ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এবার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এতে সরকার রাজস্ব আয় পাবে ও উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মৌয়াল পরিবারের জীবিকায় স্বস্তি ফিরবে।
তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বনদস্যুদের চাঁদাবাজির কারণে অনেক মৌয়াল এবার বনে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল অভিযোগ করেন, প্রতি মৌয়ালের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। একেকটি দলকে একাধিক গ্রুপকে টাকা দিতে হচ্ছে। তাই অনেকেই এ বছর সুন্দরবনে যেতে চাইছেন না।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মশিউর রহমান জানিয়েছেন, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুম শুরু হচ্ছে। এরইমধ্যে বন বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বনজসম্পদ সংরক্ষণে কঠোরভাবে নজরদারি রাখা হবে।
তিনি আরও জানান, এবারের আয়োজনে প্রথমবারের মতো পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম উপস্থিত থেকে এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। ওইদিন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে মৌয়ালদের পাস (পারমিট) প্রদান করা হবে ও দলবদ্ধভাবে তারা বনে প্রবেশ করতে পারবেন।