
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করার সময় ড্রোন হামলায় কিশোরগঞ্জের এক যুবক নিহত হয়েছেন। নিহত জাহাঙ্গীর হোসাইন (২৭) জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল-বাগপাড়া গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে। গত ১৮ মে ইউক্রেন সীমান্ত এলাকায় রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে এ ঘটনা ঘটে। নিহতের পরিবারের লোকজন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত শুক্রবার বিকালে জাহাঙ্গীরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। মা জাকিয়া বেগম ছেলের জন্য বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। জ্ঞান ফিরলেই ছেলের নাম ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি আর কিছু চাই না। টাকা-পয়সা লাগবে না, আমার ছেলেটারে শুধু ফেরত চাই।
পরিবারের লোকজন জানান, নিহত জাহাঙ্গীরের বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং মা জাকিয়া বেগম পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন। করোনাকালে পরিবারটি ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসে। এসএসসি পাস করার পর জাহাঙ্গীর একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। পরে স্ত্রী মাশুকা হোসাইনকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করলেও আর্থিক সংকটের কারণে আবার গ্রামে ফিরে আসেন।
চার মাস আগে ভালো চাকরির আশায় শ্বশুরবাড়ির আর্থিক সহায়তায় রাশিয়ায় যান জাহাঙ্গীর। তারা আরও জানান, রাশিয়ায় নেওয়ার পর প্রথমে জাহাঙ্গীরকে একটি পিগ ফার্মে কাজ দেওয়া হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবার না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে রেস্টুরেন্টে চাকরির আশ্বাস দিয়ে জাহাঙ্গীরসহ সাতজনকে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে জোরপূর্বক তাদের নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। প্রায় দুই মাস প্রশিক্ষণের পর যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হলে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই প্রাণ হারান জাহাঙ্গীর।
জাহাঙ্গীর হোসাইনের ছোটভাই জাভেদ জানান, রাশিয়ার একটি সেনা ক্যাম্পে কর্মরত তার ভাইয়ের বন্ধু মৃদুল শুক্রবার দুপুরে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মৃত্যুর খবরটি জানায়। মৃদুল জানায়, ওই ড্রোন হামলায় সেদিন সেখানে জাহাঙ্গীর হোসাইনসহ তিন বাংলাদেশি নিহত হন। নিহত অপর দুজন হলেন, মাদারীপুরের মো. সুরুজ কাজী ও কুমিল্লার মো. ইউসুফ খান। তাদের লাশ এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে রয়েছে বলেও ভিডিও বার্তায় জানায় মৃদুল।
জাভেদ আরও জানান, চার মাস আগে একটি এজেন্সির মাধ্যমে চাকরির জন্য রাশিয়ায় যান জাহাঙ্গীর। সেখানে নেওয়ার পর তাকে জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠানো হয়। দুই সপ্তাহ আগে পরিবারের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের শেষ কথা হয়। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, কিছুদিন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকবেন।
জাহাঙ্গীরের শ্বশুর রফিকুল ইসলাম বলেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আমরা পরে জানতে পারি। আমি তাকে বলেছিলাম, যেভাবেই হোক দেশে ফিরে আসতে। কিন্তু সে আর ফিরতে পারেনি।
অন্যদিকে, আড়াই বছরের ছেলে আজানকে কোলে নিয়ে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মাশুকা হোসাইন বলেন, ভালো চাকরি করে সংসারের ভাগ্য ফেরাতে রাশিয়া গিয়েছিল। কিন্তু তাকে যুদ্ধে পাঠানো হলো। এই যুদ্ধে শুধু সে না, আমরাও যেন শেষ হয়ে গেলাম।
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরানুল কবির বলেন, অফিসিয়ালি কোনো তথ্য না পেলেও পরিবারের কাছ থেকে আমরা মৃত্যুর খবর জেনেছি। তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ২ মে একই উপজেলার নোয়াবাদ ইউনিয়নের মাঝিরকোণা গ্রামের রিয়াদ রশিদ (২৮) রুশ বাহিনীর হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত হন।