ঢাকা বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

ধনিয়ায় বেশি লাভ পাচ্ছেন কৃষক

ধনিয়ায় বেশি লাভ পাচ্ছেন কৃষক

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের প্রতিটি প্রান্তর এখন সবুজের সমারোহে ঘেরা। তবে এই সবুজ আভার মাঝে কৃষক আবু ইউসুফের হাসিটা একটু বেশিই উজ্জ্বল। কারণ, তার ১২ শতাংশ জমিতে ফলানো ধনিয়া পাতার সুবাস শুধু রান্নাঘরেই নয়, তার সংসারেও নিয়ে এসেছে সচ্ছলতার বার্তা। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় যখন অনেক কৃষক উচ্চমূল্যের সার আর কীটনাশকের ভিড়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন, সেখানে আবু ইউসুফ দেখিয়েছেন কীভাবে সামান্য পুঁজি আর সঠিক পরিকল্পনায় মাটির বুক থেকে সোনার ফসল ফলানো সম্ভব।

আবু ইউসুফের এই সফলতার গল্পটি শুরু হয়েছিল মাত্র কয়েক মাস আগে। নিজের ১২ শতাংশ জমিতে তিনি যখন ধনিয়া চাষের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার মূল লক্ষ্য ছিল স্বল্প সময়ে ভালো মুনাফা অর্জন। অভিজ্ঞ এই কৃষক জানতেন যে, ধনিয়া এমন একটি ফসল যা চাষ করতে খুব বেশি জমি বা বিশাল অংকের টাকার প্রয়োজন হয় না। নিজের শ্রম আর মাটির উর্বরতাকে পুঁজি করে তিনি চাষাবাদ শুরু করেন। হিসাব কষে দেখা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় তার বীজ, সেচ এবং যৎসামান্য সারের পেছনে ব্যয় হয়েছে মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। বর্তমানে কৃষিপণ্যের বাজারে যখন উর্ধ্বগতি, তখন এত অল্প বিনিয়োগে চাষবাস করা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু ইউসুফ প্রমাণ করেছেন, নিবিড় পরিচর্যা থাকলে বড় অংকের বিনিয়োগ ছাড়াও কৃষি থেকে ভাগ্য ফেরানো যায়।

জমিতে বীজ বপনের পর থেকেই শুরু হয় তার ব্যস্ততা। তবে এই ব্যস্ততা ছিল আনন্দের। খুব অল্প দিনের মধ্যেই কচি সবুজ পাতায় ভরে ওঠে তার জমি। বাজারের চাহিদা বুঝে তিনি সময়মতো ফসল তোলা শুরু করেন। আবু ইউসুফ জানান, এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার ধনিয়া বিক্রি করেছেন। অথচ তার বিনিয়োগ ছিল তার চার ভাগের এক ভাগ মাত্র। সবচেয়ে আশার কথা হলো, তার জমিতে এখনো যে পরিমাণ ধনিয়া অবশিষ্ট রয়েছে, তা থেকে আরও বড় অংকের টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, একবারের বিনিয়োগে তিনি কয়েক গুণ বেশি লাভের মুখ দেখছেন। তার এই অভাবনীয় লাভ দেখে গ্রামের অন্য কৃষকদের মধ্যেও এখন ধনিয়া চাষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আবু ইউসুফের মতে, ধনিয়া চাষ শুধু লাভজনকই নয়, এটি অত্যন্ত কৌশলগত একটি ফসল। এটি মূলত স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় জমি অলস পড়ে থাকে না। তিনি প্রতিবছর নিয়ম করে এই চাষ করেন এবং ধনিয়া তোলা শেষ হয়ে গেলে সেই একই জমিতে অন্য ফসল আবাদ করেন। এতে মাটির গুণাগুণ যেমন বজায় থাকে, তেমনি একজন কৃষক সারা বছরই কোনো না কোনো ফসল থেকে আয়ের সুযোগ পান। মেহার গ্রামের এই কৃষকের চোখেমুখে এখন তৃপ্তির ছাপ। তিনি বিশ্বাস করেন, যারা স্বল্প পুঁজিতে কৃষিকাজ শুরু করতে চান বা অল্প সময়ে নিশ্চিত লাভ খুঁজছেন, তাদের জন্য ধনিয়া চাষ একটি আদর্শ মাধ্যম। চান্দিনার এই নিভৃত পল্লির আবু ইউসুফ আজ অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এমন ছোট ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তনের সূচক হিসেবে কাজ করে। যেখানে চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা আর ব্যবসায়িক মন্দার ভয় থাকে, সেখানে মাটির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে ইউসুফ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নিয়েছেন। তার এই সবুজ বিপ্লব শুধু তার একার নয়, বরং দেশের কৃষি খাতের সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। মেহার গ্রামের বাতাস এখন শুধু ধনিয়া পাতার সুবাসেই মণ্ডম করছে না, সেখানে মিশে আছে একজন পরিশ্রমী মানুষের সফলতার গল্প।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত