ঢাকা রোববার, ২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ

দেশের স্থবির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা চালু করা, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই তথ্য জানান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্যাকেজের মূল লক্ষ্য অর্থনীতিতে নতুন করে গতি ফিরিয়ে আনা, উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন করা এবং উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী খাতকে পুনরায় সক্রিয় করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তুত করার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬’ শীর্ষক পরিকল্পনায় দেখা গেছে, মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিলের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে গঠিত পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে, যা সরকারের গ্যারান্টির আওতায় পরিচালিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। যা ২০২৪ অর্থবছরে নেমে আসে ৪ দশমিক ২ শতাংশে। আর আইএমএফ ২০২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার ও তহবিল সাইফনিং’র কারণে আর্থিক খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। আমানতকারীদের আস্থাও কমেছে। অপরদিকে, উচ্চ সুদের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই পরিস্থিতিতে শিল্প উৎপাদন কমে গেছে, অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উৎপাদনমুখী খাতগুলো বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই মুহূর্তে অর্থনীতিকে চাঙা করতে ‘কাউন্টারসাইক্লিক্যাল ইন্টারভেনশন’ বা চক্রবিরোধী নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ, যখন বেসরকারি বিনিয়োগ ও চাহিদা কমে যায়, তখন রাষ্ট্র বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে বাজারে নতুন গতি তৈরি করা হয়। এই প্যাকেজ সেই উদ্দেশ্যেই আনা হচ্ছে।

প্রণোদনা প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরায় চালুর জন্য। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিকদের বেতন, ইউটিলিটি বিল, উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে সহায়তা দেওয়া হবে। এই খাতে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। এই তহবিল থেকে উৎপাদন, শ্রমিকের মজুরি ও রফতানি আদেশ বাস্তবায়নে ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে। এই খাত থেকে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও গ্রামীণ আয় বাড়াতে এই তহবিল ব্যবহার করা হবে। শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ৯ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পুরো প্যাকেজের সবচেয়ে বড় অংশ। রফতানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গ কৃষি হাব গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে পরিচালিত ১৯ হাজার কোটি টাকার বিশেষ স্কিমগুলোতে কিছু নতুন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিটে ৫ হাজার কোটি টাকা; কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা; চামড়া ও জুতা রফতানিতে ২ হাজার কোটি টাকা

হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রফতানিতে ২ হাজার কোটি টাকা; প্রবাসী কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা; বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা; গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১ হাজার কোটি টাকা; পরিবেশবান্ধব ও গ্রিন প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা; সৃজনশীল অর্থনীতিতে ৫০০ কোটি টাকা; স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব তহবিল বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পিকেএসএফ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।

এই প্রণোদনা প্যাকেজের অন্যতম বড় লক্ষ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে ৯ লাখ, সিএমএসই খাতে ৫ লাখ, বন্ধ শিল্প খাতে ২ লাখ এবং কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তা খাতে আরও ২ লাখ কর্মসংস্থান হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে, মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। এর ফলে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের বড় প্রণোদনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতিতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বর্তমানে যখন বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে, শিল্প উৎপাদন স্থবির এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তখন এই তহবিল নতুন আস্থা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই প্যাকেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে— বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু হবে; উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে; কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ আয় বাড়বে; রফতানি বহুমুখীকরণ হবে; বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে; সবুজ বিনিয়োগ বাড়বে; উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরবে; জিডিপি প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার হবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বড় অঙ্কের প্রণোদনা ঘোষণা করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তহবিলের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া।

অতীতে অনেক প্রণোদনা তহবিল বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগ ছিল। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রকৃত উৎপাদনমুখী খাত কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পায়নি। এছাড়া ব্যাংক খাতে দুর্বল সুশাসন, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবও বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে এই প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি শুধু স্বল্পমেয়াদি সহায়তা নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরায় গতিশীল করার একটি বড় মোড় পরিবর্তনের উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত