
রান্নায় খাবার সুস্বাদু করতে ভোজ্যতেল ব্যবহারের বিকল্প নেই। অধিকাংশ ভোজ্যতেলের সঙ্গে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলসহ স্বাস্থ্যঝুঁকির নানা উপাদান থাকায় ভোক্তা চাহিদায় বিকল্প হিসেবে কৃষকরা সূর্যমূখী চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। এতে কৃষিনির্ভর উপজেলা চরফ্যাশনে সূর্যমূখীর আবাদ বেড়েছে। এ বছর চরফ্যাশন উপজেলায় ৩৭০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় ২০ হেক্টর বেশি । ফলনও ভালো হওয়ায় এখন হলুদিয়া সূর্যমূখীতে হাসছে কৃষকের মন। উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সূর্যমুখী চাষ হয়েছে তেতুলিয়া নদীবেষ্টিত চর এলাকা মুজিবনগর ইউনিয়নে। এছাড়াও চর মাদ্রাজ, আসলামপুর হাজারীগঞ্জ, আমিনাবাদ, আবুবকরপুর, ওমরপুর ও ওসমানগঞ্জ ইউনিয়নে সূর্যমুখীর আবাদ বেড়েছে।
সূর্যমুখী ভোজ্যতেল বহির্বিশ্ব থেকে আমদানি নির্ভর হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে ফসলটির ব্যাপক আবাদ করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদনও ভাল হওয়ায় আমদানি নির্ভরতা কমে আর্থিকভাবে কৃষকরাও লাভবান হচ্ছেন। সূর্যমুখী ফসলটি হালকা থেকে মাঝারী মাত্রার লবণাক্ততা সহশীল এবং খরা সহিষ্ণু হওয়ায় চরফ্যাশন উপজেলা তথা দক্ষিণাঞ্চলে সূর্যমুখী আবাদ কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার ধার উন্মোচন করেছে।
এ তেল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। এতে ভিটামিন-ই এন্টি এক্সিডেন্ট রয়েছে। এছাড়াও এতে রয়েছে ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড যা খারাপ কোলেস্টরল (এলডিএল) কমাতে সাহায্য করে এবং হার্ট ভালো রাখে। এছাড়াও নিয়মিত সূর্যমুখী তেল খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আবাদকৃত সূর্যমুখীর মধ্যে রয়েছে হাইসান ৩৩, হাইসান ৩৬ চ্যাম্প, বারি সূর্যমুখী ৩ জাত। আবাদ করা প্রতি হেক্টর জমিতে ২-২.৫ মে.টন ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বাজার দর ভাল থাকায় কৃষকরা লাভবান হওয়ার আশায় বুক বেঁধেছেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, দেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ৩৩ শতাংশের মোট ৩০টি প্রদর্শনীতে হাইসান ৩৩ জাতের সূর্যমুখী চাষাবাদ হয়েছে। এছাড়াও তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় হাইসান ৩৬ জাতের ১৫টি প্রদর্শনী (৫০ শতাংশের) বাস্তবায়ন করা হয়েছে। স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (এসএসিপি) প্রকল্পের আওতায় ৫০ শতাংশের ১৩টি প্রদর্শনীতে হাইসান ৩৩ জাতের সূর্যমুখী আবাদ করানো হয়েছে।
চর মাদ্রাজ ইউনিয়নের সূর্যমূখী চাষী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সূর্যমূখীর তেল খেলে হার্ট ভালসহ দেহের রোগ প্রতিরোধ কমায়। তাই নিজে এক হেক্টর জমিতে সূর্যমূখী চাষ করেছি। ফলন ভাল হয়েছে। উৎপাদিত ফলন বিক্রি না বাৎসরিক সাংসারিক ভোজ্যতেলের জন্য রেখে দিব। মুজিবনগর এলাকার কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, ‘উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে আমি এবার প্রথম উন্নত পদ্ধতিতে সূর্যমুখী চাষ করেছি। ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। বাজারে সূর্যমুখী তেলের চাহিদা আছে। তেল ছাড়াও বীজ থেকে খৈল তৈরি করে পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’
আসলামপুরের কৃষক রবি উল্লাহ বলেন, ‘অন্য অনেক ফসলের তুলনায় সূর্যমুখীর ফলন ভালো। এই ফসলে সেচ ও পরিচর্যা তুলনামূলক কম লাগে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সূর্যমুখী থেকে ভালো পরিমাণে তেল উৎপাদনের আশা করছি আমি।’ তাতে স্বাস্থ্যকর তেল যেমন মানুষ ব্যবহার করতে পারবে, তেমনি কৃষকের অর্থ উপার্জনও বাড়বে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকতা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা বলেন, ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সূর্যমুখী আবাদ বৃদ্ধির জন্য কৃষি বিভাগ কাজ করছে। এ বছর চরফ্যাশন উপজেলায় ২০০০ কৃষককে সূর্যমুখী চাষ বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা কর্মসূচীর আওতায় ১ কেজি করে হাইব্রিড সূর্যমুখী বীজ ও ২০ কেজি করে রাসায়নিক সার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়াও সূর্যমুখীর উন্নত জাত সম্প্রসারণের জন্য পার্টনার প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ২ একর করে মোট ৪টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে ৮ একর জমিতে বারি সূর্যমুখী ৩ এর প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবং রোগবালাই কম হওয়ায় সূর্যমুখী ফসল খুব ভালো হয়েছে এবং কৃষকরা ভালো ফলন পাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি অফিসারের কার্যালয় এবং মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি অফিসারগণ সূর্যমুখী চাষীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছেন।